বিশেষ সংখ‌্যা।॥হে বই তোমার শব্দে বেঁচে আছি…

Background

রকাহোলিক। ।।রক মিউজিক সংকলন

স্কেচবুক “চাঁদে পাওয়া”। ।।আহমেদ নকীব

দর্শনীর বিনিময়ে। ।।মাসুমুল আলম

সাদা ধূলির দূরত্বে। ।।অয়ন্ত ইমরুল

গান গাবো বিজয়নগরে। ।।আহমেদ নকীব

রাতপত্র। ।।চঞ্চল নাঈম

মিথ্যেরা সাত বোন। ।।মোহাম্মদ জসিম

নতুন সংস্করণ:“ওরা আমাকে ঘিরিয়া ঘিরিয়া নাচে আর গুলি করে”। ।।আহমেদ নকীব

Untitled-3

Advertisements

ওয়াকিং ডিসট্যান্স ৩য় সংখ্যা

সম্পাদকীয়     

44193167_171106700463306_7766130564360306688_n

স্বদীপ বড়ুয়া’র আলোকচিত্র “ডিজিটালে হারিয়েছে বাতির দিশা”

               

গ্রন্থ আলোচনা

মিসেস নিতিয়া ও আহমেদ নকীব সম্পর্কে আমি যা যা জানি- উপল বড়ুয়া

 

কবিতা

অয়ন্ত ইমরুল

অং মারমা

আশরাফ চৌধুরী

আহমেদ নকীব

কাজল সেন

চঞ্চল নাঈম

তাহিতি ফারজানা

নাজমুস সাকিব রহমান

শুভঙ্কর দাশ

 

অণুগল্প

মোহাম্মদ জসিম

সাম্য রাইয়ান

 

চিত্রকর্ম

অরণ্য শর্মা

আহমেদ নকীব

নয়ন দে

মণি মাঝি

সান্ত্বনা শাহ্‌রিন

সোহেল প্রাণন

 

গল্প

নাভিল মানদার

মাসুমুল আলম

সুদেষ্ণা মজুমদার

 

আলোকচিত্র

অনুপম মুখোপাধ্যায়

আরেফিন অনু

তানজিন তামান্না

শিমন রায়হান

স্বদীপ বড়ুয়া

সুমিতাভ অপু

 

ওয়াকিং ডিসট্যান্স ৩য় সংখ্যা~নভেম্বর ২০১৮

cropped-walking-distance-logo.jpg

   

সম্পাদকীয়

যুগে যুগে সাহিত্যকে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচায় আসলে তরুণরাই— এটা আমাদের ভরসা দেয়। এবারও সেই ভরসার ছাপ রেখে বেরোলো ওয়াকিং ডিসট্যান্স এর ৩য় সংখ্যা…

 

শুভঙ্কর দাশ

ভিটামিন

কাকে যেন বলেছিলাম

একটু ভিটামিন কিনে দিবি?

বড় ক্লান্ত লাগে আজকাল।

এটা কোনো কাজের কথা নয়

আরো কিছুটা ওড়া বাকি রয়ে গেছে।

 
কিছু বনের গন্ধ আর সবুজ

গায়ে মাখা হয়নি এখনো।

 
আসলে লোকে তো ভুলে মেরে দেয়

এক দুই তিন করে খারাপ থাকা গোনে।

আর আমি আরেকটু ক্লান্ত হই।

 
নাহ এবার ভিটামিন খেয়ে দেখতে হবে।

এত ভালোবাসা আমার চাই না তো

এ শুধু আমাকে ক্লান্ত করছে রোজ

প্রতিদিন।

নাজমুস সাকিব রহমান

লাঞ্চ

আম্মা বলল, খালি পেটে বিপ্লব হয় না।


গোসল 

কিছু একটা লেখার জন্যে গোসল করি না কতদিন; কাটি না নখ, চুল, যৎসামান্য দাঁড়ি। আরও যা যা করার—তাও করছি। কাপড় ধোয়া বন্ধ। কিছুদিন এক চোপড়ে থাকছি। বিছানা ঝাড়ু দেয়া ভুলে গেছি। প্যান্টের সাথে উঠে আসা বালি নিয়ে থাকছি। পত্রিকার স্তুপ, নাপড়া বই—এসব জমা হচ্ছে বালিশের পাশে। এ্যাশট্রে উপচে পড়ছে অনেক না লেখার কাছে। কাগজ, কলম, অভিধান, সিগারেট, লাইটার সব রেডি। এখন একটা ঘনঘোরের অপেক্ষা করছি—

রুমভর্তি মেঘ। 
কাগজের ওপর
বৃষ্টি হচ্ছে। 
চুলায় পানি গরম।...

এখন একটা কবিতা হয়ে গেলে গোসলের পর চা খাবো। আজকাল এভাবেই নিজের শরীর ধুচ্ছি।


রাউলা 

এই যে আপনার বিয়েতে আসতে পারিনি, তাই উপহার হিসাবে একটা বাক্স নিয়ে এলাম। এটা দেখে খালি মনে হতে পারে। এটা খালিই—আমি স্রেফ বাতাস ভরে দিয়েছিলাম। আপনি চাইলে এখানে যা খুশি রাখতে পারেন। চাইলে স্বাধীনতা পেয়ে একটা প্রশ্নও ছুঁড়ে দিতে পারেন। যাকে বিয়ের দাওয়াত দেয়া হয়নি, সে কীভাবে আপনার বিয়েতে আসবে? খাবে-দাবে, ছবি তুলবে? ম্যাস কমিউনিকেশনে এগুলা হিউম্যান ইন্টারেস্ট। তাই আগেই জেনে রাখুন—দাওয়াত ছাড়াও বিয়ে, খৎনা এসব অনুষ্ঠানে যাওয়া যায়। না হলে, আপনি যে পৃথিবীতে এসেছেন, কেউ কি আপনাকে দাওয়াত দিয়ে এনেছিল?

চঞ্চল নাঈম

রাতপত্রের পান্ডুলিপি থেকে দু’টি কবিতা

২৩.
সূর্যাস্তের সমস্ত রক্তিম তাতে বায়ুর মিশ্রণ
শুশ্রূষায়, উল্কাদের উল্লাসে খানিক অনুজ্জ্বল
শীত-উষ্ণ বাতাসে দাঁড়িয়ে অতিকায় সরীসৃপ
দিগন্তের কাছাকাছি একঝাঁক জবার কুসুম
মৃদু গাঢ়, শান্তভাবে প্রতিবিম্বে মুখ ঘন লাল।
নদীস্রোত বিনিময় করে আঁধারের প্রতিচ্ছবি
নক্ষত্রীর দীর্ঘশ্বাস ধ্বনি, অগ্নিস্নানে কত দূর? 
হাহাকার নিয়ে চাকার ঘূর্ণনে সামান্য চলেছে
শেষদিকে প্রবল আবার জলবায়ু স্মৃতিভ্রমে
খুব অল্প, সারারাত জানালার পাশে সবুজাভ
আমার সম্মুখে ঝরে চুপচাপ ছটপট ক’রে 
নুনের কিছুটা স্বাদ নিয়ে মিথিলা হেঁটেছে একা
দেহের সরল রক্তবিষ সমাধানে এখনও
ভিতরে শীতল প্রত্ন অক্টোপাস যেন এলোমেলো।

২৪.
বাতাসের দূরত্বে নি:শব্দ উদ্ভিদের উপাদান
ততদূর পাতায় বিচ্ছুরা নির্ণিমেষ চন্দ্রে পোড়ে
বিষাদের জলরাশি ধীরে ধীরে ক্রমশ তরল 
শৈবাল সমূহ কিছুক্ষণ অন্তর্গত, গূঢ় কোন
উন্মাদ বায়ুতে চিরন্তন। গ্রহগুলি মহাকাশে
কিছু দূর-দূরে ঝাপসা জাগছে লাল আস্তরণে
জ্যোতিশ্চক্র অবসাদে মুখ গুঁজে আজ কেন থাকে?
ইদানিং যে-রূপে মৃত্যুচিন্তা লুকিয়ে রেখেছে ঘুম
তবু বলি, এই চিন্তায় সরল নৈশব্দ জড়ানো
স্বাভাবিক হেঁটে যায়, তখন প্রণয় বিচ্ছুরণে
কীভাবে সংলাপে জেগে যায়, অলৌকিক ভ্রান্তস্বপ্ন
রাত্রির আড়ালে বিস্মৃতির পাশাপাশি চন্দ্রোদয়
শোনায় সময় অপচয়ে মরণের নভোছক
কুয়াশা গোপনে ফুলের পাঁপড়িতে শরীর মেশায়।

তাহিতি ফারজানা

অভিপ্রায়

উচ্চারিত শব্দের বাইরে গিয়ে ডুবতে ইচ্ছে করে। 
মুদ্রাদোষে কথার মাঝে অসংখ্যবার ‘মানে’ শব্দটি ব্যবহার করতো
এমন একজনের চিন্তা এড়াতে আমি উড়ালসেতু ব্যবহার করি।

সবুজ ক্ষুধা চেপে রাখলে শ্বাস ছোট হয়ে আসে। অগত্যা
রাক্ষসী ধারের বাইরে যেতে পাল উড়িয়ে দেই। 

গ্রীষ্মের দুপুরে বাসের সিট নিয়ে স্নায়ুযুদ্ধ চলাকালে
আমাকে নস্টালজিক করে বরফকুচি মাখানো নামসমূহ।

জলভাগ ডুবে যেতে থাকে ব্যক্তিগত জাহাজে। 
অতঃপর তৃষ্ণার্তরা হাসলে দিগন্ত হাততালি দেয়।

ছায়াপথ

একটি বিষণ্ণ বেলুন
নিজেকে প্রদক্ষিণ করে বারবার-

বঞ্চনার কথা বলতে গিয়ে
তুমি আরও কিছু গুপ্ত বঞ্চনা
তৈরি করো নিজের খেয়ালে।
কাঁটা তুলতে গিয়ে
বেশুমার পুঁতে রাখো—
আরও কিছু দ্যুতিময় কাঁটা।

সিঁড়ি ভাঙতে ভাঙতে ফুরিয়ে যাওয়া বিকেল
দাঁতের আড়ালে হাসি লুকিয়ে
মিশে যায় উৎসের কাছে।

পরান্মুখ বিকেল ট্র্যাজেডির হাতকড়া পড়ে ফিরে যায়।
মূর্তমান অন্ধকারের জাল গিলে নিলে দৃশ্যপট
আকাশে ভাসে উদ্বেগ মেশানো ডানারা!

নিঃশব্দ পলক ফেলে তখন 
কেউ বুনে যায় শব্দের অধিক কথার নকশা— 

জেনেছি, তার বাকশক্তি চুরি করে
দূরে উজ্জ্বল হয়ে আছে ছায়াপথ!

কাজল সেন

নচিকেতা 

নচিকেতার নামে রেখেছিলাম আমার ছেলের নাম
যদিও সে কোনোদিন জানতে চায়নি মৃত্যুর রহস্য
বরং তার জিজ্ঞাসা ছিল জীবনের কূটনীতি নিয়ে
জীবনে কতটা ত্যাগ করলে 
কতটা ফিরে পাওয়া যায় অসামান্য অর্জন

সুনামি আসে মাঝে মাঝেই পায়ের তলায়
হয়তো ছোট নেহাৎই ছোট মাপে ও বহরে
রাতের আলো নিভে আসে দিনের অন্ধকারে
বালিমাটির আগ্রাসনে পরিচিতি হারায় পলিমাটি

আমরা কি কখনও ভেবেছিলাম 
মৃত্যুর থেকেও ভয়াবহ হবে এই জীবন
অনেকটা হাঁটার পর আদৌ থাকবে না কোনো বসার আসন 
সারি সারি দাঁড়িয়ে থাকবে শুধুই অসম্পূর্ণ শরীর   

আমার ছেলের নাম রেখেছিলাম নচিকেতা
মৃত্যুর রহস্য জানার কোনো আগ্রহ ছিল না তার
বরং সে জানতে চেয়েছিল জীবনের কুৎসিত আলো
আর অন্ধকারের কথা


পূর্ণগ্রাস গ্রহণ 

পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ দেখার জন্য সেবার অনেকেই গেছিল অযোধ্যা পাহাড়। আমি অবশ্য ঘরের উঠোনে দুটো এক্সরে প্লেটে চোখ আড়াল করে দেখেছিলাম সেই গ্রহণ। দেখেছিলাম সোনালি গোলাকার সূর্য কীভাবে ছোট হতে হতে হারিয়ে গেছিল চাঁদের আড়ালে। আর তখন আমাদের ঘরের উঠোনে নেমে এসেছিল এক আশ্চর্য মায়াবী আঁধার। 

আমি দেখেছিলাম পূর্ণগ্রাস চন্দ্রগ্রহণও। শুধু এখনও হয়নি দেখা পৃথিবীগ্রহণ। প্রকৃতির নিয়ম মেনে পৃথিবীর গ্রহণও তো হয়! পৃথিবী হারিয়ে যায় সূর্য বা চাঁদের আড়ালে!আমি ভাবি সেই পৃথিবীর পূর্ণগ্রাস গ্রহণের কথা। অদ্ভুত আলোয় ভরে যায় চাঁদের মায়াময় পিঠ। চাঁদের থুত্থরি বুড়ি চরকা কাটা ভুলে সারা গায়ে মেখে নেয় সেই অমলিন আলো। ভেসে আসে পৃথিবীর গ্রহণসঙ্গীত। স্বয়ং চাঁদমামা অধীর প্রতীক্ষায় থাকে জেগে। গ্রহণ ছেড়ে গেলে দ্রুত তাকে পাঠাতে হবে অগণিত ভাগ্নের কপালের টিপ।

আহমেদ নকীব

গোসল করবো

গোসল করবো তুমি  আমি

জামা , প্যান্ট , জুতা , চশমা
তোমরা  আমাদের  ছাড়ো ,
বোতাম  আর ব্রা, ইলাস্টিকের
কামড় তোমরা  ছাড়ো আমাদের

তুমি  আমি গোসল করবো

গোসল , তোমাকে একটা
আকার দিতে চাই , তোমাকে
বন্ধু করতে চাই, তুমি পাইপে
আছো  পানির আদলে ,
কবে  আসবে  হিসহিস করে ,
একটা ছোবলের জন্য
অপেক্ষমাণ  শরীরের জ্বর

নগ্ন হবো , বজলু ভাই ,
পানির কলটা  ঠিক করে দেন ,
প্লিজ , পানির বীর্য জমা হয়ে
আছে পাইপগুলিতে , ওরা সব
উত্তেজিত , ওদের রতিক্রিয়ার
বন্দোবস্ত হোক , ওদের সাজাও
সীসার যৌবনে , লোহার পৌরুষে ,
পানির কামিনীরা খিলখিল
করতে করতে ছুটে আসছে

ওগো গোসল , ওগো শান্তির
স্নান, আমাদের গর্ভে তোমাকে
ওম দিবো , পাইপটাকে
লাইগেশন  ভ্যাসেকটমী  করাবেন
না প্লিজ , পৃথবীর  তাবৎ পাইপ ,
সজাগ থাকো , পাইপগুলিকে
জন্মনিরোধক  পিল  খাওয়াবেন  না

ছাড়ো , কল-সকল , চিকন , মোটা ,
লম্বা , আঁকাবাঁকা , মাইল মাইল
সরিসৃপ পাইপ  সব রেডি থাকো ,
বজলু ভাই , পাইপের থ্রেডগুলি
টাইট দেন , ওই শাদা ফকফকা
টেপগুলি  নিয়ে আসেন , জংধরা
পাইপগুলিকে তিতা করলা  খাওয়ান ,
বছরের  সব বর্জ্য ওরা
বমি করে উগরে দিক

ঘুরিয়ে  দেন ঘড়ির কাঁটা  বরাবর
সব চাবি , স্টার্ট দেন পানির মেশিন

বাড়ীতে অফিসে , পাকঘরের
গোসলখানার , বেসিনের সব
কলগুলি একসাথে ছাড়ো , ছাড়ো

গোসল করবো গোসল করবো

ঝরো, ঝরো

তোমার গান শুনবো

কিন্তু, চাই না , তখন ,
ফ্লাইওভারের উপর
থেকে পানি পড়ুক !

কেনো পানি পড়বে ?

দিলাম তো নগরকর্তাকে
অনেক সারচার্জ !

আজব —

তবু আমার শাদা ধবধবে
শার্ট ভিজে গেলো !
তোমার গান শুনবো
পরিপাটি হয়ে ,
সেদিন, একদম  শুকনা
থাকবে পথঘাট ।

বৃষ্টি পড়ার পরও তবে
শুষ্ক থাকে তেজগাঁয়ের
রাস্তা ?

বজ্জাত বৃষ্টি ,
শুধু বকবক করছেই !

পরনে  আমার  ইস্ত্রি
করা প্যান্ট  থাকবে ,
আর্মির ছেলেদের
থাকে যেরকম ;
একদম চোখা নাক ,
বুক টানটান ;
এক ফোঁটাও কাপড়
কুচকাবে  না !

চাই না আমার
এখনকার এই ভাঙা
আর তোবড়ানো গাল
ধরা পড়ুক
তোমার চোখে !

তোমার সামনে
আসলে একটু
হাসিহাসি মুখ করবো —
গালটা একটু ফুলা
থাকবে তখন !

আমি বোনদের
একমাত্র ভাই,
কিন্তু একদম সাপোর্ট
করে  না ওরা আমাকে !
কেনো যে চায় না
ছোট হিসাবে আমি
ইয়াং থাকি

শিখা’পার  বন্ধু
মিলন  ভাইও নাকি
বুড়ো  হয়ে গেলাম
ব’লে  শুধু  আহাজারি
করে ;

করুক !

ভাঙা গাল নিয়ে
তোমার গান শুনতে
চাই না আমি ।

জানি তো , গান গাওয়ার
ফাঁকে , আমাকে একবার
আড়চোখে দেখবে !

মেঘ যদি আকাশের
হারমোনিয়াম  হয় ,
বৃষ্টি হচ্ছে সেই
অবিশ্রান্ত রিড ;

হ্যাঁ, আনমনা  হয়ে
হারমোনিয়ামের  রিডে
আঙুলের চাপ দিতে
তোমার ভুল হবে তখন !

আশরাফ চৌধুরী

নামহীন-এক 

আমি একটি ট্রেনের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে—
রেললাইন ফিসফিসায়; পতঙ্গ তুমি সরে যাও
তুমি পারবেনা, তোমার খুলি গুঁড়িয়ে যাবে
মাড়িয়ে যাবে মালবাহী দানব
তুমি বা তোমার সফেদ অবয়ব বিভীষিকায় 
মাতিয়ে রাখবে রেলচত্ত্বর
তুমি পারবেনা তুমি এখনও প্রস্তুত নও?
আমি আমার জীবনের ৩২তম ট্রেনের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে—
কথা বলছিলাম গুটি কয়েক প্রজাপতির সাথে। 
প্রবল বিনয়ে ভীমাকৃতি দানব—
কোন মৌলিক পরবর্তী সংখ্যাবয়ব
এগিয়ে এলে
সামনে এসে দাঁড়ালো প্রাচীণতম সুরভী;
একেকটা আলোক শিখা এখন ভেদ করে যাবে
আমার জীবাশ্ম-শরীর,
ছাই থেকে পুনরগ্নি হয়ে উঠবে 
খুব ধীরে, সূর্য উঠছে দূরে?


নামহীন-দুই

সদর দরোজায় সূর্যের লাথি
মিলিটারি কায়দায় কড়া নাড়া রোদ।
স্নিগ্ধ-উগ্র একদম নন- সফিস্টিকেটেড।
এমনই একটা সকাল দেখার উদ্দেশ্যে 
বহুবার ফিরে এসেছি অচিনপুর যেতে যেয়ে।
এভাবে সদর দরোজায় লাথি মারা
মিশুক সারথী মিচকে হাসিতে বলে যেতে থাকে,
কি ফিসফিসে আঁশটেসুরে—
সকাল? ধোঁয়া ওঠা ভোর? মাটির ঘর বেড়ার গন্ধ?
বৃষ্টিতে শ্যাওলা গন্ধা আছাড়?
সেসব তো হয় বিক্রি না হয় ভাগ হয়ে গ্যাছে কবে!
যত শৈশব বিকিয়ে কটকটি কেনা হয়েছে প্রচুর
টিকে গ্যাছে কর্পোরাল ডিশ এন্টেনা 
বহুধা বিস্তার আর রাজনীতি;
আট থেকে ষোলমুখী মাইক, প্রচুর ধর্মপ্রচার—
নিত্য নিত্য দামী দ্রব্যাদীর মূল্যে বিকিয়ে গ্যাছে
তোর শৈশব, তোর গ্রাম, তোর অচিনপুর;
খুব ছোট বেলায় দঁড়ি ছেঁড়া মোষের সামনে
বসে থাকার চেয়েও
অসহায় হতভম্ব নয় তবু এ থেমে থাকা?
কতবার ছিঁড়ে নেওয়া হলো
ভালোবাসার বুকের কাপড়, প্রচন্ড স্নিগ্ধ জায়নামাজ যত। 
তা-ও কেবল একটা সোঁদা গন্ধ শুঁকে 
বারবারই চলে যাওয়া ভুল জায়গায়—
এজন্মে 
এ ঘ্রাণ ছিলোনা আমার।
এজন্মে 
আমি ভেসে উঠিনি মৃত সারসের ডানা থেকে
কখনও আর...

অয়ন্ত ইমরুল

ময়ূরাক্ষী ঘুম

ছাদ কুটা পায়,চাঁন পারে
বহুদূর
টাঙানো থাকে রুপালি পালান।
বহুদিন
ঘুম ভেঙে গাঙের পরান ছুঁয়ে গেছে
দুধ রঙা পাখি--
সাত গাঙ তা থৈ বুকে তুমি নারী হও
হেমগন্ধী নারী--
ওই সুরমাটানা চোখে আমার যে  
বিস্ময় জাগে

আমারে নি করবা কুটুম?
ফড়িঙের ঘাসে--
সোনালি শস্যের টানে গোলার গহীনে

ও গাঙবালা--
এই ধানি রঙা দিনে কারে তুমি
জাগাও 
ছয় ঋতুর নাকাড়ায়
কারে তুমি তীর দাও চন্দন 
জলের ঢেউয়ে--
যোজনগন্ধী হাওয়ায় আমারও যে আছে
ডাহুকের দুপুর 
ময়ূরাক্ষী ঘুম
তের পাহাড় খুলে আমিও দেখাতে পারি
সুলেহকুল
এসো আসঙ্গ উড়ি

ওরে মুরারি

লাল এই প্রান্তরে আন্ধার হইল---
আহারে সন্ধে, 
কী নামে শোনাও গজল?
পাতের তারায় লো-অর্ডারের হাত কাঁপে।
যে নামে মন ফলে
তার গাঁথা মালায় অনেক গোনা প্রহর 
নিদ্রায় অনিবিড়,
এইসব রাত্রি খুঁড়ে,রাত শেকলের নীল--
ভাসা পেয়ালা,
স্লিপ হয়ে আসে বউ কথা কও।
কারে কহিবে ব্যথা?
সব মনে সব বনে উহ্য উতলিল।
উলটানো তাসের নিচে যদি না তুরুপ
ডাকপিয়নের খাকি ব্যাগে 
ইহজন্মের মেঘ,বিজলিও ওরে মুরারি--

যাও রাত্রি মিনতির মুখের আদলে 
ডাহুক হও।

সুদেষ্ণা মজুমদার

হে ঈশ্বরী!

পর্ব- ২

তিন

না, কোনোদিনও গ্রামে থাকে নাই মনলতা। যায় নাই এমনটাও নহে। আজকাল যাইতে ইচ্ছা করে খুব। শৈশবের গ্রাম আর পাওয়া যাইবে না, তাহা জানে মনলতা। তবু প্রকৃতিকে হয়তো সেইখানেই ছুঁইতে পারিবে সে। তাহার আজন্মের বাস এই শহর কলিকাতা। তবে ঠাঁইবদল হইয়াছে বার কয়েক। জিনিসপত্র গাঁটরি বাঁধিয়া টেম্পোর উপর চাপাইয়া শহর হইতে আরো দূরে শহরতলিতে যাইয়া উঠিতে হইয়াছে। সবই বাসাবদলের গল্প। বাড়িওয়ালার বাক্যবাণ সহিতে না পারিয়া; কখনো-বা কোনো যুক্তিতেই আর থাকা চলিবে না; বড়ো খোকার বিবাহ, ঘর লাগিবে ইত্যাদি। সুতরাং বাসা ছাড়িতে হইবে। মনলতার বেশ মজাই লাগিত। নূতন বাসায় যাওয়া, নূতন জায়গা, মন্দ কী? কচি বয়সে বিদ্যালয় বিষয়টি না মনলতার না তাহার গুরুজনদের মাথাব্যথার কারণ হইত। হইত বড়ো দাদা বা দিদিদের ক্ষেত্রে। মনলতা তাহার মাতা-পিতার সর্বাপেক্ষা কনিষ্ঠ সন্তান। আদর-যতন ভাগ হইতে হইতে তলানিতে ঠেকিয়াছিল। তাঁহাদের উৎসাহে ভাটা পড়িয়াছিল। অস্বাভাবিক নহে। খাইবার পেট সাতটি। রোজগেরে মানুষ একজন, মনলতার পিতা। রাজ্য সরকারে চাকুরি করিতেন তিনি। মনের প্রফুল্লতা না থাকারই কথা। মনলতার এতকিছু বুঝিবার বয়স না হইলেও সে বুঝিতে পারিত, কোথায় যেন একটু খামতি থাকিয়া গিয়াছে। ভালোবাসা বা আদর বুঝিবার জন্য বুদ্ধি, বিদ্যা বা বয়স লাগে না। একজন মানসিক ভারসাম্যহীন মানুষ, যাহাদের খুব সহজেই আমরা ‘পাগল’ বলিয়া পার পাইয়া যাই, বুঝিতে পারে কে তাহাকে ভালোবাসিতেছে, যত্ন করিতেছে। বা অসুস্থ, জ্ঞানহীন মানুষও। প্রয়োজন যা, তাহা স্পর্শ। সেই স্পর্শ লইয়া মনলতার বিধবা পিতামহী বুঝিতেন সবটা। ইহা লইয়া আক্ষেপ করিতেন না কুন্দমালা, মনলতার পিতামহী। কিঞ্চিৎ কষ্ট পাইতেন। গোপনে। তিনটি সন্তান—দুটি কন্যা, একটি পুত্রের পর পুনরায় আর একটি কন্যার জন্য প্রস্তুত ছিলেন না মনলতার মাতা-পিতা। হইয়া গিয়াছে—এই ভাবিয়া তাঁহারা অদৃষ্টকে আড়ালে আবডালে দোষারোপ করিতেন। মনলতা অনুভব করিত। পিতামহী সামলাইবার চেষ্টা করিতেন পৌত্রীকে। গল্প-উপন্যাসের চরিত্রের ন্যায় ছিলেন পিতামহী কুন্দমালা। সর্ব কনিষ্ঠা কোলপোঁছা পৌত্রীর প্রতি একটি টান ছিল তাঁহার। তিনিই নিজের নামের সহিত কিঞ্চিৎ অর্থ মিলাইয়া নাম রাখিয়াছিলেন মনলতা। বুদ্ধিমতী, আধুনিক, শিক্ষিতা এবং চোখ-কান খোলা পিতামহী কনিষ্ঠা পৌত্রীটিকে বুকে টানিয়া লইয়াছিলেন। ভবিষ্যৎ দেখিতে পাইবার কেমন যেন এক শক্তি ছিল তাঁহার। আর কাহারো ক্ষেত্রে নহে, কেবলমাত্র মনলতার ক্ষেত্রে তিনি কেমন ভাববিহ্বল হইয়া বলিয়াছিলেন, ‘মনদিদি, দুঃখ পাবি অনেক, ভেঙে পড়িস না।’ এ শুধু মনলতা আর তাহার পিতামহীর বাক্যালাপ। একান্তে। না, শৈশবে বুঝিত না ইহার মানে কী। কিন্তু ভাবিত, তাহা হইলে কি রবির মায়ের মতো দুঃখে জীবন কাটিবে? লোকের বাড়ি বাসন মাজিয়া? রবির মা প্রায়ই বলিত, ‘এত দুঃখ যেন শত্রুও না পায়। ভগবান…’ পিতামহীকে প্রশ্ন করিয়াছিল, ‘ঠাকুমা, শত্রু মানে কী?’ পিতামহী হাসিয়া বলিয়াছিলেন, ‘বড়ো হও, বুঝবে।’ ঠিক তাহাই হইয়াছিল, শত্রু শব্দটির মর্মোদ্ধার মনলতা করিল আরো কিছু বড়ো হইয়া। কিন্তু, মনলতা কখনো ভাঙিয়া পড়ে নাই। জ্ঞানত শত্রু তৈয়ার করিতে মনলতা অপটু।

পিতামহী গান গাহিতে জানিতেন। মনলতার মন ভুলাইবার জন্য রবি ঠাকুরের একটি গান প্রায়শই গাহিতেন—‘তুই ফেলে এসেছিস কারে মন মন রে আমার…’ মনলতা কল্পনা করিত, তখন কল্পনারই বয়স, রবি ঠাকুর তাহার কথা ভাবিয়াই এই গানটি রচনা করিয়াছিলেন। ওই যে ‘মন’ শব্দটি! কৌতূহলী মনলতা পিতামহীকে প্রশ্ন করিত, ‘ঠাকুমা, রবি ঠাকুর আমার জন্যই গানটা লিখেছেন? আমার নাম জানলেন কীভাবে? তুমি বলেছ?’ কুন্দমালা শিশু বালিকার মন রাখিতে বলিতেন, ‘হ্যাঁ ছোড়দিভাই তোমারই জন্য! তবে আমি বলিনি সোনা। তিনি তো ঠাকুর, সব জেনে যান।’ ইদানীং অবরে-সবরে মনলতা গুনগুন করিয়া ওঠে—‘মন মন রে আমার…’ শান্তি পাইল কি পাইল না তাহা ভাবে না সে। তাহার যে বলিবার মতো কোনো অশান্তি আছে, মনে তো হয় না। ও স্বভাব মনলতার নাই। সে মচকাইয়া পড়ে, আবার উঠিয়া দাঁড়ায়। আছে যাহা, অল্পস্বল্প। গুরুত্ব না দিবারই চেষ্টা করে মনলতা। কৈশোরে, যৌবনে যাহা গুরুত্ব পাইবার বিষয়, পঞ্চাশের কোঠায় দাঁড়াইয়া তাহা অনেকাংশে গুরুত্বহীন হইয়া পড়ে। মনের গতি ভিন্নমুখী হয়। খোঁজ পালটাইয়া যায়। গভীরের খোঁজে যাইতে চায়।

মনলতার দাদা-দিদিদের প্রতি কুন্দমালার যে টান ছিল না তাহা নহে। যথেষ্ট ছিল। কিন্তু মনলতার প্রতি যতটা, তাহা হইতে অবশ্য কিছুটা বোধহয় কমই হইবে। দাদা-দিদিরা বুঝিত। আক্ষেপ করিত। তাহা কাটাইবার জন্য পিতামহীকে মাতা-পিতার কান এড়াইয়া যতটা মৃদু স্বরে ডাকা যায়, ‘বুড়ি!’ বলিয়া ডাকিয়া মনের উষ্মা প্রশমিত করিত। এইরূপ নোংরা অভ্যাস তাহারা কোনোভাবেই গৃহ হইতে পায় নাই। এ পাড়া-প্রতিবেশীর দান। শৈশব-কৈশোরে দেওয়া প্রথম গালি। মনলতা রাগিয়া যাইত ভীষণ। তখন কুন্দমালার কতই বা বয়স? ষাট-বাষট্টি হইবে। তিনি হাসিতেন। এ-বিষয়ে কুন্দমালা নিজ-স্বভাবের বিরুদ্ধে কদাপি যাইতেন না। এক পরম স্নিগ্ধতা তাঁহার দেহে-মনে বিরাজ করিত। যতদিন বাঁচিয়া ছিলেন সংসারটিকে আগলাইয়া রাখিয়াছিলেন। চার সন্তানের মাকে সর্বদা কাজ হইতে নিষ্কৃতি দিবার চেষ্টা করিতেন। সারাদিন কাজ আর কাজ—এই ছিল কুন্দমালার দিনলিপি। সন্ধ্যা হইলে মনলতাকে সঙ্গে করিয়া বই লইয়া বসিতেন। বই পড়ার অভ্যাস মনলতার তখনই তৈয়ার হয়। পরবর্তী জীবনে যাহা মনলতাকে প্রভূত সহায়তা করিয়াছে। মনলতার মাতা-পিতা কুন্দমালার সহিত সর্বদা মনোরম সম্পর্ক বজায় রাখিয়াছিলেন। কুন্দমালার টাকাকড়ি বিশেষ ছিল না, যে, তাহা পাইবার জন্য এই সম্মান। হ্যাঁ, প্রয়াত স্বামীর পেনশন পাইতেন তিনি। আজ হইতে চল্লিশ বৎসর পূর্বে যাহা ছিল খুবই সামান্য। তাহা হইতে সামান্য কিছু হাতে রাখিয়া বাকিটা পুত্রবধূর হাতে তুলিয়া দিতেন। হাতখরচ হিসাবে। কুন্দমালা বিত্তের বড়াই কদাপি করিতেন না। যদিও কিছু ভারী গহনা তাঁহার ছিল, বিবাহসূত্রে প্রাপ্ত। পুত্রবধূকে যাহা দিবার দিয়া বাকি গহনাগুলি রাখিয়া দিয়াছিলেন পৌত্রীদের জন্য এবং পৌত্রবধূর জন্য। বিত্ত নহে, নিজ চরিত্রের কারণেই তিনি সংসারে সম্মান পাইতেন। দৃঢ় চরিত্র ও মৃদু স্বভাবের নারীটির গড়নপিটন ছিল কিছুটা হয়তো-বা পুরুষালি। লম্বা; মেয়েদের তুলনায় একটু বেশিই যেন চওড়ার দিকে। দিঘল চক্ষুদ্বয় মেলিয়া তিনি যখন কাহারো দিকে তাকাইতেন, পল্লবে ছায়া ঘনাইত। ভয়ে নয়, ভক্তি-শ্রদ্ধায়। গাত্রবর্ণ ততটা ফর্সা নহে। কুঞ্চিত কেশ, কোমর পর্যন্ত। এই বৈশিষ্ট্য মনলতার দেহেও প্রতীয়মান। ইদানীং মনলতা প্রায়শই শাড়ির অঞ্চলের প্রান্ত ধরিয়া, হয়তো বা পাকাইতে পাকাইতে আপন মনে বলিয়া উঠে, ‘কেমন করে পারতে ঠাকুমা!’ ছটফটাইয়া উঠে সে। ইহা তো ভালো লক্ষণ নহে! দীর্ঘশ্বাস ফেলিয়া বলিয়া উঠে, ‘নাহ্‌, অনেক কিছু করবার আছে।’ কিন্তু মনলতা ইহাও জানে, তাহার তেমন কিছু হয়তো-বা করিবারও নাই।

মনলতার মনে পড়ে শহরের উপকণ্ঠে একবার একটি বাসাবাড়িতে একটি পেয়ারা ও একটি নিম গাছ ছিল। আর ছিল গৃহ-লাগোয়া সামান্য কিছু ফাঁকা জমি। জমির বেড়ায় রাংচিতার ঝোপ। মোটা মোটা পাতা। মুচড়াইলে সাদা সাদা দুধের মতো ঘন কষ বাহির হইত। অগ্রহায়ণের শেষে মনলতার দাদা-দিদিদের বাৎসরিক পরীক্ষা সমাপ্ত হইবার পর তাহারা শ্যামবাজার অঞ্চলের বাসাবাড়িটি ছাড়িয়া সেইখানে গিয়া উঠিয়াছিল। শহরের তুলনায় অনেক ফাঁকা চারিধার। বিজলি বাতির চল সেই স্থলে তখনো শুরু হয় নাই। সন্ধ্যা হইলেই হ্যারিকেন জ্বলিত, ঘরের কোণে ঠাকুরের আসনে প্রদীপ। আর ডাকিত ঝিঁঝি পোকা। ছিল মশার কামড়। ভয় পাইলে মনলতা পিতামহীকে জড়াইয়া ধরিত। কুন্দমালা হাসিয়া ভয় ভাঙাইবার প্রয়াস করিতেন। ভোরের কুয়াশা অনেকক্ষণ পর্যন্ত চারিধার আচ্ছন্ন করিয়া রাখিত। ওই একফালি জমিতে কুন্দমালা কিছু শাক-সবজির গাছ লাগাইয়াছিলেন। মনলতা পিতামহীর পিছন-পিছন ঘুরিয়া বেড়াইত। হাতে-পাতে কাজ করিত। আর কুন্দমালা মনলতাকে গাছ চিনাইতে চিনাইতে গল্প করিতেন, ‘জানিস দিদু, আমি যখন ছোটো ছিলাম, একটা গ্রামে থাকতাম। সেখানে অনেক গাছ ছিল, পুকুর ছিল। এখানকার চেয়ে অনেক বেশি গাছ। আর অনেক বড়ো একটা পুকুরও ছিল জানিস! আমি কত সাঁতার কেটেছি সেই পুকুরে। শিখবি নাকি সাঁতার?’ মনলতা মুগ্ধ হইয়া পিতামহীর গল্প শুনিত। প্রশ্ন করিত, ‘সাঁতার কোথায় শিখব ঠাকুমা? আমাদের বাড়িতে তো পুকুর নেই!’ পিতামহী পৌত্রীর ছেলেমানুষিতে মজা পাইতেন। বলিতেন, ‘দুপুরবেলায় খেয়ে উঠে তোকে নিয়ে যাব। দেখবি কত বড়ো পুকুর।’ মনলতা চোখ গোল-গোল করিয়া প্রশ্ন করিত—

–তুমি কবে দেখলে? আমাকে নিয়ে যাওনি কেন?

কুন্দমালা পৌত্রীর অভিমানকে সম্মান দিয়া বলিলেন—

–তুমি তখন ঘুমাচ্ছিলে সোনা। আমি আশপাশটা দেখতে গিয়েছিলাম তো! কোথায় কী আছে, দেখে না রাখলে কি চলে? তুমিই বলো, আমি সবার বড়ো না? আমাকে তো দেখতেই হবে। তাই তো জানলাম এখানে পুকুর আছে, পুকুরের জলে সাঁতারকাটা মাছ আছে, সাদা-সাদা হাঁস সাঁতার কাটে। আজ আমি আর তুমি চুপিচুপি গিয়ে দেখে আসব। ঠিক আছে? আচ্ছা, এখন এই শিমের ডালটা ধরো দেখি, একটু ভালো করে বেঁধে মাচায় তুলে দিই। তুমি না সাহায্য করলে আমার যে কী হত!

মনলতার অভিমান নিমেষে দূর হইয়া গেল। সে তড়িদ্‌গতিতে লাফ দিয়া গাছের ডাল ধরিল। যতটা পারে পা উঁচা করিয়া পিতামহীকে সহায়তা করিতে চেষ্টা করিল। দাদা বা দিদিরা নহে, একমাত্র মনলতাকেই ঠাকুমা কাজে সহায়তা করিতে বলিতেছেন, এইটা যে মনলতার কত বড়ো প্রাপ্তি! তাহার দৃষ্টি কুন্দমালার মুখে। সেইখানে ইঙ্গিতে যদি সামান্য প্রশংসাও সে দেখিতে পায়—এই আশায়। কুন্দমালা মৃদু হাস্যে ডাল বাঁধিতে লাগিলেন। কাজ শেষে মনলতাকে কোলের কাছে টানিয়া বলিলেন, ‘আমার এই সোনা দিদিটা না থাকলে যে কী হত! আমি কোনো কাজটাই যে করতে পারি না তোমাকে ছাড়া।’ বলিয়া মনলতার গণ্ডদেশে সস্নেহ চুম্বন দিলেন। আরক্তিম মনলতা লাফাইতে লাফাইতে পিতামহীর আগে-আগে চলিতে লাগিল। হঠাৎ পিছন ফিরিয়া পিতামহীকে বলিল, ‘ঠাকুমা, ঝোলা গুড় খাবে? কাল বাবা এনেছে!’ এমন ভাবে বলিল যেন কুন্দমালা এ-সংবাদ জানেন না। শুনিলে চমকিয়া উঠিবেন! কুন্দমালা হাসিলেন। বলিলেন, ‘চলো খাই!’

 

চার

সেদিনের সেই চাবি ফেলিয়া অফিসে যাওয়া মনলতাকে যার-পর-নাই আশঙ্কিত করিয়াছিল। অফিসে কাহাকেও কিছু বলে নাই সে। মালিকের কাছে সব চাবির ডুপ্লিকেট চাবি রাখা থাকে। মনলতা মালিকের ঘরে গিয়া তাহার চেস্টের ডুপ্লিকেট চাবিটি নিবে বলিয়া মালিককে ডাকিল, ‘তন্ময়বাবু!’ তন্ময়বাবু মাথা নীচু করিয়া টেবিলে রাখা কিছু কাগজপত্রের প্রতি নিবিষ্ট ছিলেন; জিজ্ঞাসু চোখ দুটি তুলিয়া মনলতার দিকে চাহিলেন। ‘আমার চেস্টের চাবিটা একটু নিচ্ছি।’ ভদ্রলোক মুখে কিছু না বলিলেও তাঁহার দৃষ্টিতে প্রশ্ন ফুটিয়া উঠিল। মনলতা বলিল, ‘খুঁজে পাচ্ছি না। বাড়িতে বোধহয় ফেলে এসেছি।’ অবাক তন্ময়বাবু বিস্ময়ের ভাব কাটাইয়া সহজ হইলেন। মুখ খুলিলেন, ‘এমন তো আপনার হয় না!’ মনলতা মৃদু হাসিয়া জায়গা হইতে চাবি বাহির করিয়া তন্ময়বাবুকে বলিল, ‘ওবেলা ম্যাটারটা নিয়ে আসব। কিছু আলোচনা করার আছে। আপনি থাকবেন তো?’ তন্ময়বাবু জিজ্ঞাসা করিলেন, ‘কোন ম্যাটারটা?’ মনলতা বলিল, ‘বৃহস্পতিবার এডওয়ার্ড-এর যে ম্যাটারটা দিলেন। ইকোয়াল ব্যালেন্স!’ ‘হ্যাঁ হ্যাঁ… সাড়ে চারটে পর্যন্ত।’ হাসিমুখে সংক্ষিপ্ত উত্তর তন্ময়বাবুর। খুশি হইল মনলতা। এই মানুষটি যতটুকু প্রয়োজন ততটুকু কথাই বলিয়া থাকেন। কিন্তু তাহা বলিয়া অমার্জিত নন। ভদ্রলোক জানেন কতটুকু কথা বলিলে কতটুকু কাজ হয়। মনলতা এঁর সঙ্গে কাজ করিতেছে আজ প্রায় চৌদ্দ বৎসর হইবে। উনি কাজের মানুষ চিনেন। নিজে যেরূপ অক্লান্ত পরিশ্রম করেন, অন্যের ভিতর হইতে মার্জিত ভাবে, সহমর্মী হইয়া কীভাবে কাজ বাহির করিয়া লইতে হয়, তাহাও জানেন। প্রকাশনা জগতে তন্ময় চৌধুরী একটি বিশিষ্ট নাম। তাঁহাকে চিনেন না এমন কেহ অন্তত প্রকাশনা জগতে নাই। মনলতা বাহির হইয়া যাইতেছিল, পিছন হইতে তন্ময়বাবু ডাকিয়া বলিলেন, ‘মনলতা, ম্যাক্স-এর রিপোর্টটা কি হাতে এসেছে? আমার কাছে কিন্তু কোনো মেল আসেনি। আপনার কাছে এসেছে? একটু চেক করবেন তো!’ মনলতা বলিল, ‘এখনো কম্পিউটার খুলিনি। দেখে আপনাকে জানিয়ে দেবো।’ মনলতা চাবি লইয়া বাহির হইয়া গেল। সে খেয়াল করিলে দেখিত তন্ময় চৌধুরী তাহার চলিয়া যাইবার দিকে চাহিয়া আছেন। এত বড়ো সংস্থা চালাইতে গেলে জানাইয়া না-জানাইয়া সব কর্মীর উপর নজর রাখিতে হয়, জানেন তন্ময়বাবু। সে যে পদের কর্মীই হউক না কেন। মনলতা বুদ্ধিমতী, কর্মঠ, নিয়মানুবর্তী, তবু তাহার উপরেও নজরে রাখিতে হয়। বিশেষ করিয়া আজকের চাবির বিষয়টি তন্ময় চৌধুরীকে অবাক করিয়াছে! কী হইল, জানিবার চেষ্টা করিতে হইবে। তাঁহার একটি কর্মীও কোনো সমস্যায় থাকিলে ক্ষতি তাঁহার সংস্থার। এগুলি দেখিবার লোক আছে, তবু তিনি নিজের দায়িত্ব অস্বীকার তো করেনই না, নীরবে তাহা পালন করেন।

নিজ ঘরে আসিয়া মনলতা চাবি ঘুরাইয়া চেস্ট খুলিল। একে-একে হাত বুলাইয়া ফাইলগুলি ছুঁইল। এখন কোনো ফাইলই কাজে আসিবে না। এডওয়ার্ডের পুস্তকটি লইয়া তন্ময়বাবুর সহিত আলোচনায় বসিতে হইবে, বলিয়া আসিয়াছে। সুতরাং, এই ফাইলটি লইয়া কিছু কাজ করিয়া লইতে হইবে। লাঞ্চব্রেকের আগেই শেষ করিতে হইবে। কম্পিউটার চালু করিল মনলতা। নেট কানেকশন করিয়া প্রথমেই দেখিয়া লইতে হইবে ম্যাক্স-এর মেলটি আসিয়াছে কিনা। মনলতার কাছে আসিলে আশা করা যায় তন্ময়বাবুর কাছেও আসিবে। উনি তো বলিলেন আসে নাই। নেট-এর চক্রটি ঘুরিতেছে। হ্যাঁ, এতক্ষণে কানেকশন আসিল। নিজের মেল খুলিল মনলতা। আসে নাই। মেল খোলা থাক। আসিলে টের পাইবে সে। অফিসে এটি তাহার নিজস্ব চেম্বার। ছোটো হইলেও নিজস্ব। যে চেয়ারটিতে মনলতা বসে, তাহা বেশ আরামদায়ক এবং পিছনে হেলাইয়া বসা যায়। মনলতা কিছু সময় নিজেকে মেলিয়া দিল চেয়ারটিতে। ভাবিল, এত ক্লান্ত কেন লাগিতেছে? কোনো কাজে যেন মন নাই। অথচ, এই মাসেই পুস্তকটি প্রকাশ করিয়া বাজারজাত করিতে হইবে। মাথায় আছে সে কথা। পুস্তকটি লইয়া বেশ কিছু কাজ এখনো বাকি আছে। ভালো করিয়া খুঁটাইয়া পাণ্ডুলিপি পড়িতে হয়। মনলতার চেম্বারে সহায়ক পুস্তকের স্তূপ। কখন কোনটা কাজে লাগে! তন্ময়বাবু এ-ব্যাপারে কার্পণ্য করেন না। মনলতার যখন যে পুস্তকটির প্রয়োজন হয় পারচেস ডিপার্টমেন্ট-এ জানাইয়া দেয়। তন্ময়বাবুর নির্দেশ, মনলতা কোনো পুস্তক চাহিলে সত্ত্বর যেন তাহা আনাইয়া দেওয়া হয়। মনলতার উপর তন্ময় চৌধুরী প্রচুর দায়িত্ব দিয়াছেন এবং নির্ভরও করেন। মনলতা তাহার কোনোরূপ ব্যত্যয় করে না। কুন্দমালার কথা মনে পড়িল। বলিতেন, ‘মনদিদি, সারা জীবন মাথা উঁচু করে থাকবি। কেউ তোকে যেন অপমান না করতে পারে। আর একটা কথা, নিজের রোজগারে চলবি। মনে থাকবে তো?’ মনলতার তখন ষোলো, মাধ্যমিক পরীক্ষা শেষ হইয়াছে। ফলের অপেক্ষায় ছুটি কাটাইতেছে। সে জানিত কুন্দমালা কখনো অপ্রয়োজনীয় কথা বলেন না। কুন্দমালার বুকে মুখ গুঁজিয়া মনলতা বলিয়াছিল, ‘মনে থাকবে ঠাকুমা।’ কুন্দমালা মনলতার মাথায় হাত বুলাইতে বুলাইতে আবারও বলিলেন, ‘আমি কিন্তু থাকব না। আমার দিন শেষ হয়ে আসছে।’ যদিও তাহার পর তিনি আরো বছর পাঁচেক বাঁচিয়াছিলেন। মনলতার দুই দিদির বিবাহ, দাদার গৃহত্যাগ করিয়া প্রবাসবাস দেখিয়া গিয়াছেন। ‘নিজের সিদ্ধান্ত নিজেকেই নিতে হবে। এমন কোনো কাজ করবি না, যার জন্য পশ্চাতাপ করতে হয়। ভবিষ্যতের পাশাপাশি অতীতটাকেও ভাবতে হয়। বুঝেছ? তোমার বয়স এখনো অনেক কম, হয়তো বুঝবে না। খালি মাথায় রেখো তোমার কর্মফল তোমাকে এ-জন্মেই ভোগ করতে হবে। আর কেউ তোমার পাশে থাকবে না ভেবে নিয়েই সব কাজ করবে। এমন কোনো কাজ করবে না, যাতে কী করলাম, এই ভাবনায় ব্যাকুল হতে হয়। চেষ্টা করলে অনেকটাই হবে। কী? চুপ কেন?’ মনলতা বুক হইতে মাথা তুলিয়া কুন্দমালার দিকে চাহিয়া বলিয়াছিল, ‘মনে রাখব ঠাকুমা। চেষ্টা করব। আর তুমি চাইলেও আমাকে ছেড়ে কোনোদিন যেতে পারবে না। তবু বলি, ভুল করলে আমাকে ধরিয়ে দিয়ো। আমি ঠিক টের পাব।’ পারে নাই, মনলতা কুন্দমালার কথা রাখিতে পারে নাই। ভুল করিয়াছে, অনেক ভুল। পশ্চাতাপও হয়। কুন্দমালা ধরাইবার চেষ্টা করিয়াছেন, সব সময় পারেন নাই। এই সব লইয়াই বুঝি মনলতার আজকাল মনের এই অবস্থা। তাহার দিন কি শেষ হইয়া আসিতেছে? জলের কাছে যাইতে ইচ্ছা করে। বারবার। মনলতা তাহার টেবিলে রাখা ঘণ্টাটি বাজাইল।

ঘণ্টা শুনিয়া ভুবনেশ্বর আসিয়া দরজা খুলিয়া দাঁড়াইল। মনলতা হাসিয়া জিজ্ঞাসা করিল, ‘চা হবে রে?’ দুই সন্তানের জনক, বাইশ বছরের ভুবনেশ্বর হাসিমুখে মাথা নাড়িয়া হ্যাঁ বলিল। মনলতা আবার বলিল, ‘তাহলে আমাকে এক কাপ চা দে না রে! এক চামচ চিনি দিস কিন্তু। আর, দুধও দিস। বেশ কড়া করে বানাবি। আর দুটো বিস্কিটও দিস।’ ভুবনেশ্বর একটু অবাক হইল যেন-বা। মনলতা ম্যাডাম তো এমন চা কোনোদিন খান না। যদিও মনলতা গতকালও এইরূপ চা পান করিয়াছে। ভুবনেশ্বরের তাহা জানিবার কথা নহে। সে ভাবিল, আজ হইল কী! ভুবনেশ্বর মাথা নাড়িয়া চলিয়া যাইতেছিল, মনলতা ডাকিয়া বলিল, ‘একটা পানও নিয়ে আসিস।’ ভুবনেশ্বর আবারও মাথা নাড়িল। মনলতা ভাবিল, দুধ-চিনি দিয়া চা খাইলে হয়তো এই মনমরা ভাবটি কাটিয়া যাইবে। চিনি তো এনার্জি দিবে। আর চিনি দিলে দুধও লাগে মনলতার। চায়ের কথা ভাবিতেই মনমরা ভাবটি যেন এক ঝটকায় অনেকটা কাটাইয়া উঠিল মনলতা। আবার একবার মেল চেক করিল। আসে নাই। চেস্ট হইতে এডওয়ার্ডের ফাইলটি বাহির করিল। পেজ মার্ক ধরিয়া নির্দিষ্ট পাতাটি বাহির করিয়া লাল কালির কলমের ঢাকনাটি খুলিল। মার্ক করিতে হইবে। তন্ময়বাবুর কাছে আধ খ্যাঁচড়া কাজ লইয়া যাইবার কোনো অর্থ হয় না। মনলতা মন দিয়া পড়িতে লাগিল। লাল কলমটি হাতে ধরা।

গল্পের বাকী অংশ আগামী সংখ্যায় প্রকাশিতব্য

মাসুমুল আলম

পানির সহজ সংকেত

এগুলো নিয়ে তুমি ক্যানো ভাবতেছো? এসব হয়তো ফটোশপের কারসাজি। যদিও আমি তেমন বুঝি না। কি, হয়তো তুমি র‌্যাম্পে হাঁটতেছো, আর ফাজিলগুলো তোমার ক্যাটওয়াকের সঙ্গে বেড়াল না, আস্ত একটা গরুর কোমর মটকে চলনের ভিডিওটা ইউটিউবে আপলোড দিয়েছে, কিন্তু তুমি মন খারাপ করো না, সোনা। তুমি এনজয় করো সব কিছু। তুমি শার্প। একটা কাস্টিং এর দরকার ছিলো, তুমি কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়ালে তো একেবারে খাড়া-বেশ্যা। দাঁড়িয়ে থেকে, পরে, ঠিক যেই মুহূর্তে আবার তুমি এগিয়ে এলে তুমি যেনো প্রিটি উমানের পাছা-আন্দোলিত জুলিয়া রবার্টস। অবশ্যই তুমি সে-অর্থে  সুন্দর না, তুমি প্রতিভা, আফ্রিকান মডেলদের মতো তুমি, তুমি বিশাল বক্ষ বিপাশা বাসু, আমি তোমারে কুর্নিশ করি।  হ্যাঁ, তোমার প্রতিভা আছে। তোমার জন্য আমাদের সকলের পক্ষ থেকে স্ট্যান্ডিং অডিশন!

প্রতিভা একটা প্রতিক্রিয়াশীল শব্দ। কেউ কেউ বলে থাকে। উইলিয়াম ফকনার, নাম জানো তার, তিনি বলছেন, প্রতিভার বিষয়টা তিনি শুনেছেন, কিন্তু চোখে দ্যাখেন নি। নোবেল জয়ী ফকনার হলিউডি ছবির স্ক্রিপ্ট লিখেছেন। আমার ধারণা, এমনতরো লোকদের মস্তিষ্কে অনেকগুলো প্রকোষ্ঠ থাকে। সেসব চেম্বারে আলাদা আলাদা কাজের এনকোড। না হলে তো স্যাংচুয়ারি, দি সাউন্ড অ্যান্ড দি ফিউরি, অ্যাজ আই লে ডাইং এক একটা মেলোড্রামা-ই হয়ে উঠতো। চিত্রজগতের নষ্টামি ওনার ছিলো কিনা জানি না, তবে নিশ্চয় পৃথক পরিস্থিতি বোঝার আত্মাভিমানটা ছিলো। না-থাকলে উনি হুয়ান রুলফো-মার্কেজ এঁদের পূর্বসুরি কিভাবে হবেন!

যখন ক্যান্টনমেন্টে যে মেয়েটা রেপের পর খুন হয়ে যায়, আর যে মেয়েটা বগুড়া থেকে ফেরার পথে বাসের মধ্যে রেপড এবং তার লাশ মধুপুর জঙ্গলে পাওয়া যায়-এটা তবে অ-নে-ক দিন আগের কোনো ঘটনা? ক-তো-দি-ন? ক-তো যুগ? শতাব্দি ব্যাপী বিস্মরণ কি? মার্কেজের ওয়ান হান্ড্রেড ইয়ারস অব সলিটিউড-এর মতো? আমি তোমাকে বলছি একটা ক্যুইজ, কৌন বানেগা ক্রৌড়পতি, কি নাম ওদের, ঐ গণধর্ষিত নিহতদের? কম্পিউটার জ্বি, তালা লাগা দিয়া যায়, যাঃ শ্লা, আমিই তো বলতে পারছিনা। কেননা, এখানে ঘটনাপ্রবাহ সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো আছড়ে পড়ছে। একটার পর একটা। একটার পর একটা। একটার পর একটা। তখন তুমি, তোমাকে, তুমি মেধাবী হওয়া সত্ত্বেও, সৌন্দর্য প্রতিযোগিতায় কোয়েশ্চেন রাউন্ডে হঠাৎ তোমার পানির রাসায়নিক সংকেত মনে না-ও পড়তে পারে। এবং তুমি পারলে না। বদ্ধমূল ধারণা, সুন্দরীদের আপার চেম্বার খালি হয় (সে-অর্থে তুমি সুন্দরী না), তোমার আই কিউ নিয়ে লোকজন তোমারে ফে্‌ইসবুকে খুব ট্রল করলো। উত্তর দিতে ইংলিশ এ্যাকসেন্টে বাংলা উচ্চারণের মধ্য দিয়ে তোমার লুক্কায়িত সলজ্জ দ্বিধাটা আমি টের পেলাম। সবাই জানলো যে, তুমি জানো না, কিন্তু তুমি তোমার স্মার্টনেস দিয়ে হাসিহাসি গোটা পরিস্থিতির উত্তরণ ঘটালে, যে, H2O নামে ধানমণ্ডিতে একটা রে-স-টু-রেন্ট আছে!

হ্যাটস অফ টু ইউ, আমি তোমারে নড করলাম, বাহ! তখন বুড়ি ভৈরব বা নাফ নদীর উপকূলে জনৈক লোকটি– দ্যাখো, ঘটনার ঘনঘটায় নামটাও তো মনে করতে পারছি না এখন, একের পর এক, একের পর এক শুদ্ধি অভিযানে নামটাই ভুলে গেছি, সোনা! – গুলিবিদ্ধ হুমড়ি খেয়ে পড়তেই অজস্র আত্মার আর্তচিৎকার শুনলাম, তারপর সাইলেন্স। ডেডস্টপ। তারপর মুকুট শোভিত বিজয়ী তোমার হাসি মুখটা দেখলাম। ব্যাপক করতালি। তোমার নামটা যেনো কি!

নাভিল মানদার

ভাদুরে বৃষ্টি

কী সুন্দর সবুজ ঘাসের মাঠ। যেখানে ঘাসের সবুজ আজো সবুজ। একটু আশা জেগেছিলো, যখন কেউ বললো,— “বৃষ্টি হোতে পারে”। পরক্ষণে মনে মনে সে ভাবলো,— কেউ যদি একজন তাকে একটি ছাতা দিতো। পাশের ফুটপাত দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে একজন পথচারী বললো— “ভাদুরে বৃষ্টি বড্ড বিরক্তিকর”।

বাজারে গিয়ে সে একটি ছাতা কেনার সিদ্ধান্ত নিলো। বৃষ্টির জন্যে তার রেইনকোট ছিলো কেননা বৃষ্টিকে সে খুব উপভোগ করতো। কিন্তু সেটা ছিলো বাড়িতে— বাক্সবন্দী। বৃষ্টির দিন যেন কেমন— সব কিছু মনে পড়ে যায়। সবকিছু বৃষ্টির দখলে চলে যায়।

যে কোনো ঘরের চাল বৃষ্টির সময় ভিজে যায়।

ভিজে যায় সাইকেলের টায়ার। আর ঝালমুড়ি ভীষণ পছন্দ করে শহরবাসী।

তুমুল বৃষ্টি। শহরের রাস্তাগুলো জনশূণ্য। নির্জনতায় রাস্তারা উজ্জ্বল হোয়ে উঠেছে। দু’পাশের সারি সারি দোকানগুলো হঠাৎ নিষ্পাপ চোখে চেয়ে আছে। ছুটি শেষে দুই স্কুল ছাত্রের ভীষণ ভিজে ভিজে বাড়ি ফেরা। সদিচ্ছায় ভরপুর তাদের চঞ্চল দেহ। তাদের ধবধবে শাদা দাঁতের হাসি অবমুক্ত হোয়ে ছড়িয়ে পড়েছে বৃষ্টির শরীরে।

বীজ বপন বাদেই কীভাবে সারা মাঠজুড়ে ঘাস হয়। ভাব আর নির্ভাবনার মতো নরম ঘাস। সবুজ ঘাস। বিকেলের মধ্যে প্রবেশ করে সবুজ বিকেল। এমন দ্বৈত বিকেল ধীরে ধীরে সন্ধ্যার দিকে রওনা দিতে উদ্যত। মাঠের দিকে দৃষ্টি ফেলে এইসব প্রস্থান মুহূর্ত দেখা যায়।

ছাতা কেনার আগে সে কাঠের হাতলটা শক্ত কিনা দেখে নিলো।

গত কয়েক বছর খুব বজ্রপাত হচ্ছে। ফলে ভেজার যা একটু ইচ্ছে হয় তাও মরে যায়। আজ অবশ্য কোনো আওয়াজ নেই। নির্মল বৃষ্টি। বাতাশের ভেতর ব’য়ে যাচ্ছে ঠান্ডা হাওয়া। কেউ কেউ ফুলহাতা শার্ট পরেছে।

“বৃষ্টির ফোঁটা পবিত্র, জুতোর পাড়া দিতে হয়না”— মা বলেছিলো।

দু’পায়ের প্যান্ট গুটিয়ে হাতে তুলে নিলো জুতো। সে নিজেকে বললো,— “খালি পায়ে হাঁটা স্বাস্থ্যের পক্ষে ভালো।” মাথায় ছাতা ফুটিয়ে দ্রুত হাঁটতে লাগলো। পাড়ার দোকান থেকে মুড়ি আর চানাচুর নিয়ে বাড়ি ফিরে স্ত্রীর হাতে নোতুন ছাতাটা দিতে দিতে সে খুশি মনে বললো,— “ভাগ্যিস বেরোনোর আগে সর্ষের তেল মেখেছিলাম, মনে হয় এবারের মতো আর ঠান্ডা লাগবে না।”

মোহাম্মদ জসিম

শূন্য

হাজার টাকার নোট—অথচ খুব নীরিহ নিরুপদ্রপ আর নিরহংকার জীবন যাপনে অভ্যস্ত। সাদামাটা চালচলনের জন্য সকলের শ্রদ্ধার পাত্র, সত্যবাদী আর পরোপকারী হিসেবেও সুনাম রয়েছে তার।

কেউ সহযোগিতা চাইলে না করতে পারেন না। একবার একজন তার কাছে সাহায্য চেয়েছিলো, তিনি কিছুটা সময় দুশ্চিন্তায় ভুগলেন কিভাবে সাহায্য করা যায় ভেবে ভেবে। তারপর নিজেরই শরীর থেকে গহনার মতো জ্বলজ্বলে নিটোল একটি শূন্য খুলে দিলেন। অন্যদিন আরেকজন এসে হাত পাতলো। আরেকটি শূন্য খোয়ালেন হাজার টাকার নোট। আরেকজন এলো, গেলো শেষ শূন্যটিও। এখন তিনি এক অঙ্কের সংখ্যায় পরিনত হয়েছেন। এক, এবং একা। চিনাজোঁকের মতো বাঁকানো পিঠ—সামনে পিছনে কেউ নেই।

কারো কাছেই আগের মতো পাত্তা পান না আর। প্রভাব প্রতিপত্তি সম্মান সবই হারিয়েছেন। অন্যকে সাহায্য করা দূরে থাক, নিজেরই সাহায্য দরকার এখন।

শেষমেস তিনি স্মরনাপন্ন হলেন সেইসব লোকের যারা একসময় তার আশেপাশে ঘুরঘুর করতো, বিপদে আপদে তার ছায়ায় আশ্রয় নিতো। তাদের আচরন খুব শীতল, কথাবার্তা নিরস। হাজারের নোটটি তাদেরকে আকারে ইঙ্গিতে মনে করানোর চেষ্টা করলেন, কোন একদিন তাদের বিপদ দেখে নিজের শরীরের সৌন্দর্য খুলে দিয়েছিলেন তিনি।

অকৃতজ্ঞ লোকগুলো একথা শুনে ক্ষেপে যায়, কেউ হাসে—বিদ্রুপ করে। বলে—আরে মিয়া, দিছেন তো একখান শূন্য। শূন্য মানে বোঝেন! গোল্লা। কিছুই না। এক দলা বাতাস। কোন কামে আহে না এই জিনিস।

কুস্তিগীর শের আলীর মতো একসময়ের পালোয়ান বাঘ হাজারের নোটটি বিড়বিড় করতে করতে সামনে এগিয়ে যায়। শূন্য, মাত্র কয়েকটা শূন্য…

মিসেস নিতিয়া ও আহমেদ নকীব সম্পর্কে আমি যা যা জানি- উপল বড়ুয়া

46310722_2225670030982846_3129631111114653696_n

মিসেস নিতিয়া ও বৃষ্টি বিষয়ক রহস্য উদঘাটনের আগে চলুন ঘুরে আসা যাক আহমেদ নকীবের পুরনো কাব্যজগৎ থেকে। কবি আহমেদ নকীবের সঙ্গে আমার মুখোমুখি দেখা ও বিড়ি ফুঁকা গত ২০১৮ ফেব্রুয়ারি থেকে। কিন্তু আরো পাঁচ বছর আগে থেকেই আমি উনাকে জানি। উনার কবিতা জানা মানেই তো উনাকে জানা। এবং আমি কবিতা ও কবি দুইজনকেই জানতে চাই যেহেতু…। একদিন হাতে এলো ‘আহমেদ নকীবের কবিতা সংকলন (নামটা ভুলও হতে পারে)। কিন্তু তার কিছু পঙ্কক্তি এখনো মুখস্ত বলে দিতে পারি। একবার ঝুম বৃষ্টিতে বারিধারা থেকে ফেরার সময় উনাকে এসব বলে-টলে স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে চমকে দেওয়ারও চেষ্টা করছিলাম । অন্ধকারে আমার জানা হয় নাই উনি চমকাইছিলেন কিনা। গাড়িতে বসে বলছিলাম, ঘুম তছনছ/ যেন সে শুকনো পাতা।’  এসব শুনে নকীব ভাই মৃদু কি হাসছিলেন? প্রশ্ন রেখে গেলাম।

তবে নকীব ভাই খুলে দিছিলেন তার বিখ্যাত কবিতার চরিত্র আলমের  ইতিহাস। হে আলম, যে ছিল ওয়েল্ডিং মিস্ত্রী। মই নিয়েই আকাশ ছুঁতে পারতো। তারপর ঘুরে ফিরে এলো ‘মহাপুরুষের জোব্বা’র কথা। ‘জোব্বা প্রদর্শনী চলছিলো- মহাপুরুষের জোব্বা; তবে সেই একই দশা; বোঝা গেলো তার একটা হাত লম্বা হয়ে ঢুকে পড়েছে নীতি নির্ধারকের ভূমিকায়।’ 

 এই কবিতা যখন প্রথম পড়ি থমকে গেছিলাম। তখন সাহিত্যের ‘স্যাটায়ার’  টার্মটার সঙ্গে পরিচয় ঘটেছে। জর্জ অরওয়েলের ‘অরওয়েলিজম’ নিয়ে হালকা-পাতলা মাথা ঘামাইতেছি। তো, এই স্যাটায়ার-রোমান্টিকতা  মিলেই আহমেদ নকীব। তাই নয়, শহুরেপনা, যান্ত্রিকতা হাতুড়ির চিৎকার, দাঁত মুখ খিঁচে থাকা দালানে ঝঞ্জাল, স্ক্রু-ড্রাইভার, তলপেট ফুঁড়ে দেওয়া ড্যাগার, ঝিগাতলা, গ্রীনরোড, তেঁজগাঁও ঘুরে ঘুরে তিনি আমাদের নিয়ে যান এয়ারপোর্টে। উড়োজাহাজে তুলে নিয়ে যান এডিনবরা। কিংবা সদ্য বিদেশ ফেরত মিসেস নিতিয়া এয়াপোর্টে নেমেই ফোন করেন আহমেদ নকীবকে-

‘উনি এয়ারপোর্টে এসে ফোন করলেন;/ আমি বললাম: আপনি এখন ঢাকায়?/ -হ্যাঁ, এই মাত্র আসলাম। এখানে কী যে  বৃষ্টি!/ -কই না তো। তেজগাঁওয়ে তো রীতিমতো খরা। ’

[তখন জুড়া-জোড়া খরগোশ হয়ে পালিযে গেল]

এই যে মিসেস নিতিয়ার সঙ্গে আহমেদ নকীবের লুকোচুরি-বৃষ্টি বৃষ্টি খেলা, এইটা আমাদের মতো তরুণদের মনে হিংসের উদ্রেক করে। জেলাসি করে আমাদের। আমাদেরও ইচ্ছে করে মিসেস নিতিয়ার শাড়ি পরা দেখি, কিংবা বৃষ্টিতে ভেজা নাভি। কিংবা তার খোলা চুল। আমরা কল্পনা করি নিতিয়ার অবয়ব; বৃষ্টিতে ভেজা এক লম্বা ছিপছিপে গড়নের মধ্য বয়সী নিতিয়া। আমি তাকে ভালবেসে ফেলি অজান্তে। মিসেস নিতিয়া আমাকেও যদি বাচ্চা বলতেন। নিতিয়া, নকীব ভাইয়ের মতো আমিও ভালবাসি আপনাকে। কখনো কখনো ইচ্ছে করে আপনার চলাচলের রাস্তায় গাড়ি আটকায়া রাখি।

‘কথা বলতে চাই, দেখতে চাই/ মিসেস নিতিয়াকে অথচ এত/ এত গ্রীনরোডের প্রেম, আমরা/ গ্রীনরোডের রোদের নিচে দাঁড়িয়ে/ থেকে গ’লে যাচ্ছি, গ’লে যাচ্ছি,/ আমাদের অপেক্ষার বুদবুদ ফেটে/ যাচ্ছে, আর বিড়বিড় করছি, / নিতিয়া, নিতিয়া!’

[সবুজ মুখ]

নিতিয়া আপনি একটা জ্বর, ঘুম ঘুম লাল চোখ। ইরোটিক। আপনাকে পড়ি। আপনাকে পড়ে পড়ে কল্পনা করি। আপনি সর্বজনীন। আপনার বিদায় আমাকে বিরহে মথিত করে। মিসেস নিতিয়া-

‘জানি, মিসেস নিতিয়াকে; মানুষ ছিলেন একদা/ স্তন ছিঁড়ে ফেলে রেখে চলছে তাহার দিন, পায়ে চাকা!/ কেন যে এত এত লম্বা লাইন ধরে শিশুরা এগিয়েছে তার পিছে পিছে,/ যদি শূন্যে লাফিয়ে উঠে মিসেস নিতিয়া ঝাঁপ দেন কোটি কোটি/ মাইল নিচে, শিশুরাও কি দিবে লাফ সামনে মরণ জেনেও!/ কে তবে খাওয়াবে দুধ এই ছেঁড়া স্তন থেকে?/ আমিও কি লাফিয়ে পড়বো অনন্ত কুয়ার ভেতরে যদি তাকে না পাই আর?/ আর এই পাথরে, ঢাকা শহরের হৃৎপিণ্ডে, তার স্তন বপন করব আমি-/ পাবো বুঝি তাকে এক গাছের রূপেতে: / গাছে গাছে অনেক স্তন ঝুলে আছে, উড়ে আসে শিশুর দল/ নতুন স্তনের দিকে!’

[ফাতরা প্রেম]

মিসেস নিতিয়ার সাথে বৃষ্টি আসলো যেদিন। আহমেদ নকীব। প্রকাশন: উড়কি। প্রথম প্রকাশ : ফেব্রুয়ারি ২০১৮।

অং মারমা

বুয়া 

০১.

উটেরা চিনে নক্ষত্র আর পাখিরা চিনে গাছ।
ঠিক একইভাবে, 
আমিও একজন রান্নাকরা বুয়া'কে চিনি।

তার খয়েরী মনের রঙ,
কপালে বয়েসের ছাপ, চোখের নীচে চিন্তার ছায়া।
সেই চোখের তলে তার জীবন, তারই ভাঙা ঘর।

তিনি তরকারি কুটতে কুটতে ভাবেন-
আজ তার রোগাটে স্বামীর ওষুধ শেষ,
চাল কুলাবে না রাত্রে, আলু আছে তিন চারটে
তেল আছে, লংকা নেই।
যাগ'জ্ঞে, পানিতেও সেদ্ধ করে খাওয়া যাবে সেইসব।
চাল ধুতে গিয়ে তিনি নিজের চোখের জল নিজেই ধুয়ে নেন, চুপচাপ-
উনুনে বসিয়ে দেন ভাতের পাতিল।
তাই তো বলি, ভাতের কাছে
মাঝেমাঝে এতো বালু কেনো,পাথর কেনো, গন্ধ কেনো।

আজ তার নিজের বলে কিছু নেই জেনে গেছে, যেকারণে-
এখন কোনো অভাব আর তাকে তেমন করে 
কখনো দুঃখবোধ করাতে পারে না।

এখন শুধু ঝোল তুলে মুখে নেই,
নুন কম হলে নুন দেই, বেশি হলে কিছুই করেনা।
মাঝেমাঝে ছেলে স্কুল বেতনের কথা ভাবতে ভাবতে
ঠিকঠাক ভাত ফুটেছে কি ফুটেনাই 
তার খবর ও তিনি নিতে জানেন না।

আমি জানি, রান্না করতে করতে তারও সাধ করে
আজ তার বাসায় মলা মাছের রান্না হবে 
খিচুরি দিয়ে মুর্গী হবে।
ছেলের নতুন জামা হবে, স্বামী আগের মতো'ই ক্ষেতে যাবে, সবজি বেঁচবে।
গরু নিয়ে ফিরবে বাড়ি সন্ধ্যায়....
আসলে, বুয়ারাও চাই তার ও একজন বুয়া হোক।


০২.

খোদা, বুয়াদের হাতে বাড়িয়ে দিও স্বাদ
আমিও খেয়ে বাঁচি অন্তত দু' মুঠো ভাত।

ওয়াকিং ডিসট্যান্স ১ম সংখ্যা

সম্পাদকীয়

ছবি: ওয়াকিং ডিসট্যান্স

 

কবিতা

তাহিতি ফারজানা

শিমন রায়হান

গল্প

উপল বড়ুয়া

মোহাম্মদ জসিম

চিত্রকর্ম

নয়ন দে

মুক্তগদ্য

সাম্য রাইয়ান

নাভিল মানদার

তানজিন তামান্না

অনুবাদ

মাসুমুল আলম এর অনুবাদ : ওসামা আলোমার এর ছোটগল্প

আলোকচিত্র

সাম্য রাইয়ান

তানজিন তামান্না

ওয়াকিং ডিসট্যান্স ১ম সংখ্যা~সেপ্টেম্বর ২০১৮

cropped-walking-distance-logo.jpg

ওয়াকিং ডিসট্যান্স ২য় সংখ্যা

সম্পাদকীয়

Tanjin Tamanna r Photography

ছবি: তানজিন তামান্না

 

মুক্তগদ্য

সাম্য রাইয়ান

 

কার্টুন

মোজাই জীবন সফরী

 

কবিতা

অয়ন্ত ইমরুল

আহমেদ নকীব

কাজল সেন

শিমন রায়হান

সাম্য রাইয়ান

 

চিত্রকর্ম

আহমেদ নকীব

নয়ন দে

মনি মাঝি

সান্ত্বনা শাহ্‌রিন

সোহেল প্রাণন

 

গল্প

উপল বড়ুয়া

তানজিন তামান্না

মাসুমুল আলম

সুদেষ্ণা মজুমদার

 

অণুগল্প

মোহাম্মদ জসিম

 

আলোকচিত্র

আরেফিন অনু

কাজল সেন

সুমিতাভ অপু

 

ওয়াকিং ডিসট্যান্স ২য় সংখ্যা~অক্টোবর ২০১৮

cropped-walking-distance-logo.jpg

সম্পাদকীয়

লেখকদের সাড়া পেয়ে ভালো লাগছে। আসলে লেখকরা খুব ভালো। লেখকদের বন্ধুত্ব ভালো। লেখকদের দ্বন্দ্বও ভালো। নতুন নতুন লেখায় লেখকরা বেঁচে থাকুক। দেখতে দেখতে বারীন দা’র একটা বছর চলে গেলো। দেখতে দেখতে ২য় সংখ্যা…

 

সাম্য রাইয়ান

 

বাঘ

আমার মেয়েটি কিছুদিন থেকে বাঘের মাংস খেতে চায়৷ বাঘ বাঘ করে স্বপ্নে চিৎকার করে আমায় জড়িয়ে ধরে বলে, বাঘ— আমি বাঘের মাংস খাবো৷

বাঘ খুঁজতে বাজারে গিয়েছিলাম৷ পেলাম না৷ মেয়ে বললো, বাবা চলো জঙ্গলে যাই; জঙ্গলে অনেক বাঘ আছে৷

বউকে সাথে নিয়ে জঙ্গলে হাজির হলাম বাঘ খুঁজতে৷ অপেক্ষায় থেকে থেকে ক্লান্ত হয়ে হঠাৎ দূরে বাঘের গর্জন শুনতে পেলাম৷ সতর্ক আমি, ধীরে— ট্রিগার চেপে দিলাম গুলি বেরিয়ে লাগলো বাঘের পেটে৷ শব্দ হলো অনেক৷ কোত্থেকে যেন অতর্কিত চিৎকার এলো, ফায়ার—, একটা গুলি আমার কানের পাশ দিয়ে গেল৷ আমিও গুলি ছুঁড়লাম৷ গোলাগুলি হলো বেশ৷ দেখি— বউটা আমার পড়ে আছে, পাশে মেয়েটাও৷ চিৎকার করে ডাকলাম, বউ ওঠো—, ওঠো বাঘের বাচ্চা, কেউ উঠলো না৷ কারও ঘুম ভাঙলো না৷ শুধু পুলিশ এলো৷

আমাকে আদালতে তোলা হলো৷ বাঘ মেরেছি বলে ১২ বছরের কারাদণ্ড হলো আমার৷ শাস্তির ভারে নূয়ে পড়ে বললাম, আমার স্ত্রী–কন্যা — তাদের মৃত্যুর শাস্তি কেউ পাবে না? আদালত বললেন, অবশ্যই আমরা সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে৷

শিমন রায়হান

 

ময়ুরকুমারী

রুপকথার গল্পে- দূরতিক্রম্য নদী, চোরাবালি
দেওদানব আর আমাদের হাসফাস
এসব পেরিয়ে চুম্বন পোলভোল্ট খেলে
আলিঙ্গন পেরোয় পুলসিরাত
জাদুর ঘুমে রাজকন্যা আর সবচে উঁচু মিনার থেকে
নেমে আসে দুঃস্বপ্নের আশ্চর্য প্যারাস্যুট
ডালিমকুমারের হাতের তালু ঘেমে যায় উদ্বেগে
তবু রুপকথার নীল বইয়ে তার প্রতিশোধ
সংশয়ের রাতে ধনুক হারিয়ে পায়
পীতরঙা ঘোড়ার সুতীব্র জিন
মখমলের ফুল উড়ে যায় সূচিকর্মের বিকল্প নগরে


লেজ ও নাটাই বিষয়ক

লেজ দেখে কুকুরকে ঘুড়ি মনে হয়
ঘুড়িকে কুকুর
কেবল দৃশ্যান্তরের ফাঁকে
কোথাও নাটাই হাতে বসে থাকছেন প্রভু

কাজল সেন

 

অপেক্ষায় আছে এক রূপালী সকাল

অধিক মদ্যপানে সে অচঞ্চল স্থির। বরং কম মদ্যপানে তার শুরু হয় মাতলামি। তখন মদের নেশায় সে তার ছেলেকে মনে করে বাবা আর মেয়েকে মা। বৌকে মনে হয় শাশুড়ি আর শাশুড়িকে নেহাৎই বাল্যখিল্য চপলাকুমারী। যদিও চপলতা আদৌ ছিল না তার প্রতিদিনের যাপনে। চপলার সাথেও ছিল না কোনো তাপ বিনিময়ের খেলা। তবুও কেন যে সাগর উথলে ওঠে মধ্যদুপুরে! নদীতে ধেয়ে আসে ষাঁড়াষাড়ি বান! ভেসে যায় নির্দ্ধিধায় সেয়ানা চাতাল! ফুঁসে ওঠে দুরন্ত ফুটবল, ফুটবলের ছাল!  কতটা মদ্যপানে কতটা মাতাল, অঙ্ক কষে যদিও মাপা হয়নি তার পরিমান, তবে রাত্রি গভীর থেকে গভীরতর হলে নগ্ন হয় রাতের বাথান।

অপেক্ষায় আছি। অপেক্ষায় আছে এক রূপালী সকাল।

 

অপেক্ষায় আছে এক সোনালি দুপুর

এতক্ষণ কৃষিকাজের আলোচনার পর আমরা আলোচনা করতেই পারি শিল্প সম্পর্কে। শিল্প অর্থে ভারীশিল্প, মাঝারিশিল্প, হালকাশিল্প। আবার প্রাসঙ্গিক আলোচনায় আসতেই পারে হস্তশিল্প, পদশিল্প, চক্ষুশিল্প বা হৃদয়শিল্পের কথাও। যার শিল্প যত নিপুণ তার ততই মান। তাকে অনায়াসেই দেওয়া যেতে পারে দক্ষ শিল্পীর সম্মান। আর হাতে যদি কিছুটা সময় থাকে তাহলে আমরা অবশ্যই সেরে নিতে পারি কিছুটা সংস্কৃতির কথাও। মানে সংস্কৃতি, সুসংস্কৃতি, অপসংস্কৃতি। এছাড়াও আছে লৌকিক সংস্কৃতি, অলৌকিক সংস্কৃতি, পারলৌকিক সংস্কৃতি। এবং অতঃপর আমরা অনুপ্রবেশ করতেই পারি সঙ্গীতচর্চায়। আসলে আলোচনাটা নিরন্তর চালিয়ে যাওয়া দরকার। আর এভাবেই আলোচনা থেকে সমালোচনা, সমালোচনা থেকে পর্যালোচনা, পর্যালোচনা থেকে…

অপেক্ষায় আছি। অপেক্ষায় আছে এক সোনালি দুপুর।

আহমেদ নকীব

 

পোকা হয়ে যাবো

আমি যে মানুষ থেকে আজ পোকা হবো,
অথচ পোকারা সভা করে নিবে কিনা
এরকম স্যুটপরা লোকটাকে দলে

স্বামী তার রতিক্রিয়া ছেড়ে উড়ে যাবে 
পতংগের দলে, পাগল হয়েছে ভেবে
ডাক্তার ডাক্তার ডেকে একাকার সবে

কিভাবে লুকাবো মুখ আসবাব ঠেলে
চলেছি এবার তাই রক্তমাংস ফেলে

আমাকে পোকারা এখন হয়তো খাবে
শব ভেবে অন্ধকার ঝোপে, যার আজ
নেই কোনো চোখ আর মানুষের সাজ

 

গান গাবো বিজয়নগরে

ঝিঁঝিঁপোকা তোমাকে
কি যে রহস্যময় লাগে

ঝোপে বাজছে ঝুমঝুম

ছরতা দিয়ে ছ্যাতর ছ্যাত
শব্দ করলে তুমি ভাবো যে
তোমার জোড়া এসে দাঁড়ালো
লক্ষ্মীপুরের ছাদে

আর যদি প্রিয় সুপারি গাছ
থেকে নেমে কাছে আসো
আমিও একটা ঝিঁঝিঁ’র
মেয়ে হবো, আমার হাত
বাড়িয়ে দিবো তোমার
ঝিঁঝিঁ পাখার ঐকতানে

আমরা বাজাবো
শিখা’পার জার্মান রিডের
হারমোনিয়াম, যদিও
ছিঁড়া তানপুরা, একটা তারের,
সেও একসাথে সংগত
করতে এসে ঝিঁঝিঁ’র এক
প্রেমিক পুরুষ হবার লোভ
সামলাতে না পেরে আমাদের
গায়ে গা ঘেঁষে বসে পড়বে

ঝিঁঝিঁ তুমি কিন্তু লাজুক
হয়ে আবার উড়ে যেয়ো না

সবাই মিলে আমরা
ঝোপে ঝোপে তারস্বরে
গান গাবো বিজয়নগরে