সম্পাদকীয়

ওয়াকিং ডিসট্যান্স শিল্প ও সাহিত্যের একটি ওয়েব ম্যাগাজিন। অল্টারনেটিভ ধারার এই ওয়েব ম্যাগাজিনটি তার যাত্রা শুরু করলো। ওয়াকিং ডিসট্যান্স নিয়ে আপনার মন্তব্য অবশ্যই কাম্য। আপনাদের অংশগ্রহণ আমাদের এগিয়ে যেতে অনুপ্রেরণা দেবে…

 

Advertisements

মাসুমুল আলম এর অনুবাদ : ওসামা আলোমার এর ছোটগল্প

রুমাল

স্বৈরশাসক একটা হাঁচি দিলেন। তারপর প্যান্টের পকেট থেকে স্বাধীনতাটাকে বের করলেন আর নাক ঝাড়লেন। তারপর তিনি ওটাকে জঞ্জালের ঝুড়িতে ছুঁড়ে দিলেন।

অবাধ নির্বাচন

আর যখন ক্রীতদাসগণ কোনো রকম চাপ ছাড়াই সর্বসম্মতিক্রমে একজন জল্লাদকে পুন:নির্বাচিত করলো, বুঝতে পারলাম গণতন্ত্র এবং মানবীয় মর্যাদার প্রশ্নে কথা বলার সময়টা তখনো আসে নি।

নখ

দু:খভারাতুর নখের টুকরোটি আধখানা চাঁদের দিকে নিবদ্ধ ছিলো। “আমাদের দুর্ভোগের কথাটা কখন শুনবেন প্রভু?”, নিজেকে সে বললো, “কখন তিনি তার ঐ নির্জন গজদন্তমিনার থেকে নেমে আসবেন আমাদের অভিযোগগুলো শুনতে? তাঁর আর আমাদের মধ্যে কী গভীর দূরত্ব! গোটা দুনিয়া তাঁর অধিষ্ঠানের দিকে নির্নিমেষ তাকিয়ে! সন্দেহ নেই যে এটা সুন্দর….ভয়ংকরভাবে সুন্দর!”

অভিপ্রকাশের স্বাধীনতা

নাগরিকদের অভিব্যক্তি প্রকাশের অধিকার বিষয়ে সরকার বাহাদূর একটা ডিক্রিজারি করলো। এই পদক্ষেপ একধাপ অগ্রগতি বলেই বিবেচিত হলো, বিশেষ করে, অনেক দেশেই যখন এ ধরণের অভিপ্রকাশ একদম নিষিদ্ধ। আর লক্ষ জনতা সুমহান গণতন্ত্রের অভূতপূর্ব বিজয়-স্মারক হিসেবে রাস্তায় রাস্তায় ব্যাপক সমাবেশ করলো। চওড়া হাসিসমেত মার্চপাস্ট করে গেলো তারা, আর তাদের মুখমণ্ডল আবৃত ছিলো উল্লাসময় কিম্ভূত সব মুখোশে।

আবরণ

নির্মম বাস্তবতার ভূ-খণ্ডের ওপর থেকে আমি তখন সরু আর বর্ণিল কল্পনার দীপ্তিময় আবরণটা সরিয়ে ফেললাম। চমৎকার একটা দৃশ্যসৌন্দর্যের সূচনা হলো, কিন্তু তার ভূ-প্রকৃতি ঠিক আগের মতোই রয়ে গেলো, একই রকম।

ওসামা আলোমার

ওসামা আলোমার ছবি- সংগৃহীত

ওসামা আলোমার ১৯৬৮ সালে সিরিয়ার দামেস্কে জন্মগ্রহণ করেন। গত এক দশক ধরে মার্কিন ইমিগ্রান্ট। সিরিয়ার রাজনৈতিক পরিস্থিতি আর উন্মূল অভিজ্ঞতা তাঁর সাহিত্যিক বীক্ষণ তৈরি করেছে।

 

শিমন রায়হান

মায়াহরিণ

যেহেতু হরিণের নেই আয়নার জ্ঞান
আব্বা-মা আমার দেখা প্রথম মায়াহরিণ
আদর পেলেই তাদের ঈশ্বর লাগে
                      এদনের বাথানে
আধখাওয়া ঘাস মুখে নির্নিমেষ ছবি হয়ে থাকি
থাকি স্বল্পায়ু মাছের মুদ্রায়
আমাদের সাক্ষাতে-বিচ্ছেদে ভাসে
খোদাবন্দের জ্বরের খবর
জ্বরের জিভে থাকে জলস্বাদ পৃথ্বীর

কথাকার্ণিশ

খেলাটা খেয়ালের বশে শ্বাসরুদ্ধকর হয়ে এলো
আর শব্দসমূহ হতে থাকল হৃদয়ের ঠোঁট
কী ধূসর কোলাহল
এরপরেও ওৎ পেতে থাকা টিকটিকি দুটিকে
সেলফিশ বলা সঙ্গত হবে না
যেহেতু এই নির্জনতা বিস্ময় হয়ে পৌঁছোচ্ছে না
কেউ নেই অথচ অদ্ভূত জড়তায়
বাড়ি ফেরা হয়নি কিংবা বাড়িই ছিল না বলে
বুলফাইটের ময়দানে আচানক আটকে যাওয়ায়
টাইমমেশিনের প্রয়োজনীয়তা মনে পড়ছে
কথার কৌশলে বাড়ছে ছেদ ও ছায়া

অপ্রকৃতিস্থ ঘোড়ার নাইটমেয়ার

এমনকি ক্ষুধা বশে রাখার প্রস্তাবে
আমাকেও খেয়ে ফেলতে পারো তুমি

কথাসৃ

ছবি: ওয়াকিং ডিসট্যান্স

তাহিতি ফারজানা

ব্যাথা ক্ষয়িষ্ণু হও

ব্যাথা এক অনির্বাণ সূর্যমুখী
যার জিভ পুড়ে গেছে চৈত্রদাহে
তবু সে ফণা তোলে,
আলগোছে ঢুকে পড়ে মানুষের অলিন্দে।

আরও এক ছায়া নেমে এলে 
প্রথম ছায়াটি ডুবে যায়।
দু’একটি পরিচ্ছন্ন রাত আমাকে ডেকে নিয়ে গেলে
হিজলের অবিরাম ঘ্রাণে চাপা পড়ে পৃথিবী।

দূরে দাঁড়িয়েছ তুমি- দুর্ভেদ্য মিথ
—কাছে তীব্র এক ঝাউবন শোঁ শোঁ
—কাছে মৃত পালক শ্বাস নেয় ক্ষীণ।
কান্না ধোঁয়া আমূল আকাশ ব্যথা ঝরে গেলে
ঝুঁকে পড়ে কথা বলে খুব
পাঁজরের নিচে লুপ্ত পাখিটির মতো।

আমাদের পিছে পিছে চলে
হাওয়ায় চাপিয়ে দেয়া শোক।

জলের কামড়ে লাল চোখ
ব্যাথা ক্ষয়িষ্ণু হলে—
অবহেলা ছিঁড়ে উড়ে যায় অবিশ্রান্ত আলোয়।

যাদুকর

যখন গোলাপ তার গাম্ভীর্য নিয়ে
হেলে পড়ে বিকেলের দিকে
একটি শূন্য বাক্স থেকে
বেরিয়ে আসে একজোড়া খরগোশ।
বিস্ময়ের মতো সাদা।

হাতের কারসাজিতে
ঝকমকে পায়রা গুলো
কয়েন হয়ে ফিরে আসে মুঠোয়।

তবু তোমার আর ভিড়ের ব্যবধানে
লুকিয়ে ডাকে
কোন সে অভাব!
সাড়া দেবার ছলে ম্যাজিকে ঢুকে পড়ো
অজান্তে।

যাদুকর—
তোমার কালো রুমালের ভেতর
প্রকাণ্ড জীবন চাপা পড়ে গেছে ইল্যুশনে।
ফণা তুলছে হাততালি!
অদৃশ্য

ছবি: ওয়াকিং ডিসট্যান্স

নাভিল মানদার

কল্পনার নাম সন্ধ্যা

গতকালের সন্ধ্যার সাথে আজকের সন্ধ্যার কোনো পরিচয় আছে কী? হয়তো আছে। হয়তো তারা সহোদর। কী অলৌকিক সুন্দর এই সন্ধ্যা! যেখানে আবছা অন্ধকারের ঘন হোতে আপত্তি আছে। কেননা তাতে সে ফুরিয়ে যায়। রাত এসে ছোঁ মেরে শিকার কোরে নিয়ে যায় রূপসী সন্ধ্যাকে। বিশ্বাস করো, পুরোটা দিন বেঁচে থাকা যায় কেবলমাত্র এমন একটি সন্ধ্যার জন্যে।

এমন একটি ছায়া ছায়া আঁধারের মতো আলো যা দারিদ্রে লালিত সিংহাসন থেকে সম্পূর্ণ আলাদা এক সূর্যাস্ত। সেই সন্ধ্যার দেশে তোমার বেড়াতে যাওয়ার স্বপ্ন,- তোমাকে আরো অপরূপ কোরে তোলে। তুমি একবার কল্পনা করো- তোমার পায়ের নিচ দিয়ে ব’য়ে যাচ্ছে স্নিগ্ধ সন্ধ্যা। আর শান্ত অন্ধকার তোমাকে চিনিয়ে দিচ্ছে সান্ধ্যবাতির কাঁপা কাঁপা উদ্বেগ।

তুমি তো জানো তোমার নাম আর তোমার নিরবতা। সেখানে অরণ্য আছে, আছে কুঠারের শব্দ। অপূর্ব আসবাবপত্রে মাঝে মাঝে তুমি হারিয়ে যাও। তুমি আরো জানো, তোমার কল্পনা তোমাকে পথ দেখায়। সেই কল্পনা- যার নাম সন্ধ্যা। সন্ধ্যার দেশ। হেঁটে হেঁটে সেখানে যাওয়া যায়। পথের দু’পাশে ধূ ধূ নিমন্ত্রণ। উর্বর আঁধার ভেসে ভেসে চিত্রিত কোরছে বর্ণাঢ্য বারান্দা। পাশাপাশি বর্ণ, চিত্রের ভেতর প্রকাশ কোরেছে বারান্দার আরাধনা। এমন সুন্দর আরাধনা পাড় বেয়ে নেমে গেছে নিস্তরঙ্গ পুকুরে। পুকুরের ওপারেও চুপিচুপি পৌঁছে গেছে অপরূপ সন্ধ্যা। গতকালের তোমার সাথে আজকের তোমার কোনো পরিচয় আছে কী? হয়তো আছে। হয়তো তারা সহোদর। কী অলৌকিক সুন্দর এই তুমি। তোমাকে দেখতে খুব সুন্দর লাগছে…

“প্রতিসন্ধ্যা”

ছবি: ওয়াকিং ডিসট্যান্স

মোহাম্মদ জসিম

আড়াল

“আড়াল” ছবি: ওয়াকিং ডিসট্যান্স

হ্যালোইন

পৃথিবীতে এখন প্রতিটি রাতই হ্যালোইনের—বাহারি মুখোশ পড়ে ঘুরঘুর করবার সময়। সচরাচর মানুষের মুখ আর চোখে পড়ে না। মানুষ তার অভ্যাস ও অভিব্যক্তি হারানোর পর, যে যার পছন্দমতো পশু-পাখির মুখোশের আড়ালে মুখ লুকিয়ে থাকে, যদিও আচার আচরনে এখনও তেমন কোন পরিবর্তন আনতে পারেনি। বলা চলে—পশু ও পাখিদের চরিত্রে অভিনয় করে মজা পাচ্ছে তারা। কেউ গাধার মুখোশে কেউ ঘোড়ার মুখোশে কেউ বাঘ—সিংহের মুখোশে হাতি, হায়েনা কিংবা বাজপাখির মুখোশে ঘুরছে কেউ কেউ!

এতসব মুখোশের ভীড়ে একদিন একজনকে দেখা গেল মুখোশবিহীন। তাকে নিয়ে হাসলো সবাই। কৌতুক করলো, ক্ষেপালো। পাগল বললো কেউ কেউ। তার মুখে মুখোশ ছিলো না কোন। যেন—মুখোশের রাজ্যে একজন অ্যালবিনো। যখন সে হালুম হালুম গর্জন তুলে ঝাপিয়ে পড়লো, তখনই জানা গেল একটি চতুর সিংহ মানুষেরই মুখোশ পড়ে পৃথিবীকে বোকা বানিয়েছে।

 

“ব্লগজিন বা ওয়েবজিনের ধারণাটাই আসছে লিটল ম্যাগাজিনরে কেন্দ্র করে।”- উপল বড়ুয়া

ওয়াকিং ডিসট্যান্স’র ওপেন উইন্ডো সেপ্টেম্বর ২০১৮ তে কথা হয়েছে এ সময়ের অন্যতম লেখক ও কবি উপল বড়ুয়ার সঙ্গে…

41746965_1857057181015198_100619148031164416_n

কবি ও লেখক উপল বড়ুয়া

ওয়াকিং ডিসট্যান্স: উপল বড়ুয়া, কেমন আছো? ওয়াকিং ডিসট্যান্সের সেপ্টেম্বর ২০১৮ ওপেন উইন্ডোতে তোমাকে স্বাগতম ও অভিনন্দন…

উপল বড়ুয়া: তোমাদের সাইটটা দেখতেছি। ভাল হইতেছে।

ওয়াকিং ডিসট্যান্স: প্রথমেই জানাতে চাই আমাদের এই আড্ডার বিষয়টাকে ৪টা পর্বে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে।

প্রথম পর্ব: যে উত্তরতম হেঁটে আসো…

এই পর্বে তোমার কাছে জানতে চাইছি তোমার লেখালেখি শুরুর গল্পটা। কখন এবং কিভাবে লেখালেখির জগতে প্রবেশ করলে? ছোটোবেলা থেকে কি এমন ইচ্ছা ছিলো যে লেখক হবো?

উপল বড়ুয়া: ওকে আলাপটা তোমারে ধন্যবাদ জানায়া শুরু করি। যেহেতু আমার কথা জানার জন্য তুমি সময় দিতেছো। ওকে। লেখালেখির শুরুটা মূলত আমার বাবাকে (অভি বড়ুয়া) দেখে। উনি কবিতা লিখতেন। না খেয়ে-দেয়ে বই কিনতে ভালোবাসতেন। নব্বই দশকের শেষ দিকে উনি ‘পালা বদলের ইস্তেহার’ নামে একটা কাব্যগ্রন্থও পাবলিশ করেন। এছাড়া ‘মহার্ঘ্য’ নামে একটা লিটলম্যাগও সম্পাদনা করতেন। ঐ সময়টাতে আমি সম্ভবত থ্রি বা ফোরের ছাত্র। তো, আমার বাপরে দেখতাম বেকার অবস্থায় রাত জেগে চেরাগের আলোতে লিখে চলেছেন। প্রকাশিত কবিতা কেটে ফাইলবন্দী করতেছেন। বা টাকা ধার চেয়ে বন্ধুর কাছে চিঠি। অধিকাংশ সময় উনার চাকরি থাকতো না। এদিকে একাডেমিক লাইফ আমার ভাল লাগতো না। সময় আমি কাটাইতাম তার জমানো বই পড়ে বা ডায়েরী ঘেঁটে। তো এই করতে করতে কোন সময় লেখার জগতে ঢুকে পড়ছি তা খেয়াল নেই। ছাপার অক্ষরে আমার প্রথম কবিতা প্রকাশিত ‘দৈনিক কক্সবাজার’ পত্রিকায়। আমার বাপের হাত ধরে। যদিও প্রথম জীবনে আমার জীবনের লক্ষ্য ছিল ফুটবলার হওয়া। কিন্তু ঐটাতে ব্যর্থ হওয়ার পরপরই লেখালেখির দিকে ঝুঁকে যাওয়া।

দ্বিতীয় পর্ব: সমুদ্দুরে চোখ…

ওয়াকিং ডিসট্যান্স: এবার ২০১৮ এর জঙশন লিটল ম্যাগাজিনে তোমার একটি গল্প “গল্পের ভেতরের গল্পহীনতা” প্রকাশিত হয়েছে। জঙশন তো বাংলাদেশের অন্যতম একটি লিটল ম্যাগাজিন। নিজেকে লিটল ম্যাগাজিনের লেখক হিসাবে দেখতে তোমার কেমন লাগে? লেখালেখির শুরু থেকেই কি এমনটা ভাবতে যে লিটল ম্যাগাজিনই হবে তোমার লেখালেখি চর্চার জায়গা?

উপল বড়ুয়া: লেখালেখির শুরুতে আমি কেবল লেখালেখিই করতে চাইছি। ২০১৪ সালের দিকে আমার হাতে কিছু মূলধারার লিটল ম্যাগাজিন এসে পড়ে। গান্ডীব, দ্রষ্টব্য, শিরদাঁড়া একবিংশ, লিরিক, জঙশন, বিন্দু, চারবাক, সতীর্থ, পথরেখা, ওপেনটেক্স্ট পড়াকালে ভাবি নাই, কেবল লিটল ম্যাগাজিনে লিখবো। যদিও এর আগে বাংলা একাডেমির ‘উত্তরাধিকার’ বা সমকালের ‘কালের খেয়া’তে সামান্য লিখছি। কিন্তু লিটল ম্যাগাজিন আমার সাহিত্যের ধারণা পাল্টায়া দিছিল। লিটল ম্যাগাজিন ধারণাটা বৃহত্তর। আমি অত সহজে নিজেরে লিটলম্যাগের লেখক দাবী করতে পারবো না। ভন্ডামি হয়ে যাবে। সাহিত্যের নতুন মাধ্যম ব্লগজিন বা ওয়েবজিনেও নিয়মিত লিখছি আমি। সঙ্গে অ-লিটল ম্যাগাজিনেও। এটা ভাল হইতো যদি প্রতিষ্ঠানবিরোধী কয়েকটা ম্যাগে লিখতে পারতাম। আমাদের সাহিত্যে বড় একটা পরোক্ষ পরিবর্তন ঘটিয়ে দিয়ে গেছে প্রতিষ্ঠানবিরোধী ছোট কাগজগুলো।

ওয়াকিং ডিসট্যান্স: অনেকে লিটল ম্যাগাজিনের সাথে ব্লগজিন বা ওয়েব ম্যাগাজিনের বিরোধীতা আছে বলে মনে করে। এ বিষয়টা নিয়ে তোমার নিজস্ব মতামত কি?

উপল বড়ুয়া: এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগে আমার ঋত্বিক ঘটকের কথা মনে পড়ে গেলো। মাধ্যম যাই হোক, শেষ পর্যন্ত তুমি-আমি কিন্তু লিখতে পারলেই সুখি। এই খাতা-কলম বা কি-বোর্ড—এটাই আমার মাধ্যম। বাকিটুকু স্রেফ একটা পত্রিকা যা করে— তাই। ব্লগজিন বা ওয়েবজিনের ধারণাটাই আসছে লিটল ম্যাগাজিনরে কেন্দ্র করে। সুতরাং এটা অনেকটা পার্টি ভেঙে দল করার মতো ব্যাপার। আর প্রতিটা ক্ষেত্রে বিরোধ থাকাটা আমি পছন্দ করি।

ওয়াকিং ডিসট্যান্স: চট্টগ্রাম থাকাকালীর তোমার সম্পাদনায় একটি লিটল ম্যাগাজিন “টঙ” প্রকাশিত হতো যার প্রকাশনা এখন বন্ধ আছে। “টঙ” প্রকাশ করার ইচ্ছাটা বা ভাবনাটা কেনো ও কিভাবে এলো? দীর্ঘদিন ধরে টঙের প্রকাশনা বন্ধ থাকার কারণ কি?

উপল বড়ুয়া: ‘টঙ’ বন্ধ হওয়ার মূল কারণ মানসিক দূরত্ব। সঙ্গে আর্থিক অভাব তো ছিলই। দুই সংখ্যা বের করার পরই কাজটা বন্ধ করে দিতে হয় আমাদের। লিটলম্যাগ করার উদ্দেশ্য বলতে যা থাকে আর কি— পকেটের পয়সা খরচ করে বাংলা সাহিত্যে আমরা কিছুটা ভাঙচুর চালাতে চেয়েছিলাম। সেই ভাঙচুরে আমরাই একদিন ভেঙে যাই। এখনো প্রেস বাবদ কয়েকহাজার টাকা পরিশোধ করতে পারি নাই। একটা সময় সন্ধ্যাকালে কবি বন্ধু কুহন ও আমি চট্টগ্রামের চকবাজারে একটা টঙে নিয়মিত আড্ডা দিতাম। আমাদের সঙ্গে আরো ভাই-ব্রাদার থাকতো। তো ঐখান থেকেই ‘টঙ’র যাত্রা। আমাদের দারুণ একটা উশৃঙ্খল সময় ছিল। সময়ে-অসময়ে উইড ও ওয়াইনে মশগুল থাকতাম। তো এসব করতে করতেই সময় গেছে। ‘টঙ’ করা হয়ে উঠে নাই। অবশ্য তৃতীয় সংখ্যার জন্য কিছু লেখা সংগ্রহ করা শুরু করছিলাম। পরে টের পাইছি, আমাদের নিজেদের ভাবনায় দূরত্ব তৈরি হয়ে গেছে। এরপর সরে পড়ছি যে যার মতো।

ওয়াকিং ডিসট্যান্স: তোমার প্রথম বই “কানা রাজার সুড়ঙ্গ” এবং দ্বিতীয় বই “উইডের তালে তালে কয়েকজন সন্ধ্যা”। বই দুইটার বিষয়ে জানতে চাই?

উপল বড়ুয়া: দুইটা বই-ই হুট করে করা। অগ্রিম সিদ্ধান্তহীন। ২০১৫ সালে ‘কানা রাজার সুড়ঙ্গ’ করার পর অনেক ঝামেলা পোহাতে হইছে। বইতে বানান ভুলের পাশাপাশি বাঁধাইয়েও সমস্যা ছিল। পরের বছর ‘খড়িমাটি’ প্রকাশনীর মনিরুল মনির ভাই রিস্ক নিয়েই বইটার সংশোধিত সংস্করণ প্রকাশ করেন। এরপর প্রায় কবিতা লেখা ছেড়ে দিছিলাম। তিন বছরে ২১/২২টা কবিতা জমছিল। গত বইমেলায় মাঝ সময়ে হুট করে বই করার প্রস্তাব দেন ‘উড়কি’ প্রকাশনীর মোশারফ খোকন ভাই। প্রস্তাবটি আসে মূলত সাগরনীল দীপ খান ভাইয়ের মাধ্যমে। তো তিন-চারদিনে মধ্যে পান্ডুলিপি গুছিয়ে বই (উইডের তালে তালে কয়েকজন সন্ধ্যা) করা। বড় পরিকল্পনা নিয়ে আমি কখনো কাজ করি না। তবে এই সুযোগে ধন্যবাদ জানাই, দুইটা অনবদ্য প্রচ্ছদ করে দেওয়ার জন্য দুই প্রিয় শিল্পী অরণ্য শর্মা ও রাজীব দত্তকে।

 

ওয়াকিং ডিসট্যান্স: তোমার কি মনে হয় একজন তরুন লেখকের নিজের প্রথম বইটা প্রকাশ করবার উপযুক্ত সময় কখন?

উপল বড়ুয়া: নির্দিষ্ট কোন সময়ের দরকার নাই। যখন মনে হবে তখনই অ্যাকশন নেয়া যায়। লেখা থাকেলেই হইলো। কোন ধরণে লেখা নিশ্চয় বুঝতে পারতেছো।

ওয়াকিং ডিসট্যান্স: দ্বিতীয় দশক প্রায় শেষ হতে চললো। এই দশকে যেসকল লেখক লিখতে শুরু করেছেন তাদের নিয়ে তোমার মতামত কি?

উপল বড়ুয়া: মতামতে আমার আস্থা নাই। তবুও বলি, তারা যেন সিনিয়রদের মধুর বাক্য না শুনে নিজের হৃদয়ের কথা শুনে।

ওয়াকিং ডিসট্যান্স: তৃতীয় দশকে যেসকল লেখকরা আত্মপ্রকাশ করতে চলেছে তাদের উদ্দেশ্যে কিছু বলতে চাও?

উপল বড়ুয়া: আমার হৃদয়ের ভাইবোনেরা যেন সত্তুর থেকে দ্বিতীয় দশকের সকল কবিকে অস্বীকার করতে শিখে। এবং তারা যেন হয়ে উঠে বেদনার একেকটা ভারবাহী ঘোড়া।

ওয়াকিং ডিসট্যান্স: লেখকদের জন্য সিন্ডিকেটের বিষয়টাকে কিভাবে দ্যাখো? একজন লেখকের জন্য আদৌ কি এর কোনো প্রয়োজনীয়তা আছে?

উপল বড়ুয়া: সিন্ডিকেট ভাল জিনিস। সিন্ডিকেট বনাম সিন্ডিকেটের বিরোধে ভাল কিছু তৈরি হলেই হলো। তবে একজন লেখকের জন্য কোন প্রকার সিন্ডিকেটের দরকার নেই। সে যেন সিন্ডিকেটের ভেতরও একা একা হাঁটে। নিজের সঙ্গে নিজেই সিন্ডিকেট করে বসে।

ওয়াকিং ডিসট্যান্স: লেখকের লেখালেখির জন্য আড্ডা কি কোনো ভূমিকা রাখে?

উপল বড়ুয়া: আড্ডা সাহিত্যের প্রাণ। কিন্তু আড্ডার বাইরেও ভাল সাহিত্য রচিত হইতে পারে। শেষ পর্যন্ত তো তোমাকে নিজের ভাবনাটা কারো না কারো সঙ্গে মুখোমুখি শেয়ার করতে হবে। আড্ডার ধরণটা বদলে গেছে। এই যে, তুমি আর আমি এখন অনেক দূরত্বে থেকেও কতো কথা বলতেছি। সাহিত্য মূলত এই কম্যুনিকেশনটা তৈরি করে দেয়।

ওয়াকিং ডিসট্যান্স: সাহিত্যের ক্ষেত্রে পুরষ্কার দেয়া ও নেয়ার প্রথাটাকে কিভাবে দ্যাখো?

উপল বড়ুয়া: পুরস্কার যার দরকার সে নেবে। ঐটাতে আমার মাথা ব্যথা নাই। প্রাচীনকাল থেকে মানুষ তার কাজের স্বীকৃতি চায়। সেই ইচ্ছা থেকে এসব অ্যাওয়ার্ড দেওয়া-নেওয়া। তা সর্বক্ষেত্রে বিরাজমান। এটা চলমান প্রথা। তবে আমি কখনো পুরস্কার চাই না। এমনকি তা কয়েক লক্ষ টাকার হলেও। পুরস্কারের জন্য আমি লেখালেখি করতে আসি নাই। লেখালেখির করে যদি কেউ সম্মানী দেয় তা সাদরে গ্রহণ করি। আর অনেকরে লেখা দেওয়ার সময় আগেই বলে দিই, টাকার পরিমাণটা।

ওয়াকিং ডিসট্যান্স: তোমার গানের প্রতি আলাদা একটা ঝোঁক আছে। শহুরে ব্যান্ডের সাথেও যুক্ত ছিলে। গান নিয়ে কি কোনো পরিকল্পনা আছে? শহুরে ব্যান্ড নিয়ে বিস্তারিত জানতে চাই?

উপল বড়ুয়া: মিউজিক। এই মনোটোনাস লাইফে আমার এখন একমাত্র নেশা হচ্ছে গান। গান শোনা। আমি আজান দেওয়ার আগ পর্যন্ত গান শুনি। হেডফোন কানেই ঘুমায়া যাই। গান শোনার ক্ষেত্রে আমি সর্বভূক। এমন না যে, ভোরের দিকে রবীন্দ্রসঙ্গীত শুনি। ভোরের দিকে আমার রক মিউজিক শুনতে ভাল লাগে। আর শহুরে’র সঙ্গে এখনো আছি। কিন্তু কিলোমিটারের দূরত্ব বেড়েছে। শহুরে’র ভোকাল তৌকির মাহমুদ ও গিটারিস্ট সাফায়েত আদীবের সঙ্গে বহুবার কথা হয়েছে দুইটা গানের রেকর্ড নিয়ে। কিন্তু সময় ও আর্থিক সংকটের কারণে কিছু্ই হয়ে উঠছে না। তো সামনে শহুরে-কে নিয়ে একটা গদ্য লিখতেছি। আশা করি, খুব শীঘ্র এতদ্ববিষয়ে তুমি বিস্তারিত জানতে পারবা।

ওয়াকিং ডিসট্যান্স: কখনও কি সিনেমা ডিরেকশন দেয়ার ইচ্ছা আছে? কখনও যদি সাহিত্য নির্ভর সিনেমা ডিরেকশন দাও তবে কার লেখা সিলেক্ট করবে?

উপল বড়ুয়া: গত বছরও আমি শর্টফিল্ম বানানোর জন্য হাজারখানেক টাকা জলাঞ্জলি দিছি। শ্যুট করতে যাব—এমন সময় আমার ক্যারেক্টাররা হাওয়া। সিনেমা বানাতে পারবো কিনা জানি না। তবে সাহিত্য নির্ভর সিনেমা বানাতে চাই না। স্ক্রিপ্টটা আমি আলাদাভাবে লিখতে চাই। 

তৃতীয় পর্ব: ফেসবুক টাইমলাইন

ওয়াকিং ডিসট্যান্স: তুমি একবার তোমার একটি ফেসবুক স্ট্যাটাসে দ্বিতীয় দশকের তোমার প্রিয় দশজন লেখকের নাম উল্লেখ করেছিলে। এটা নিয়ে ঐ সময় তোমাকে বেশ হেনস্থা হতে হয়েছিলো। সেই অভিজ্ঞতা প্রসঙ্গে জানতে চাই?

উপল বড়ুয়া: মোটামুটি হেনস্তার শিকার হতে হইছিল। প্রহারের হুমকি-ধামকিও দিছিল অনেকে। অনেকজন ব্লক/আনফ্রেন্ড করছে ফেসবুকে। আমি তা বেশ উপভোগ করতাম। যাদের নাম নিই নাই তারা এখনও সাহিত্য করে। মূলত সময়টাতে আমি তাদেরকে আরো বেশি অ্যাগ্রেসিভ ভাবে লিটারেচার করার জন্য ধাক্কা দিতে চেয়েছিলাম।

ওয়াকিং ডিসট্যান্স: বেশ কিছুদিন আগে তোমার একটি ফেসবুক স্ট্যাটাসে কবিতাকে কোবতে লেখায় একজন বেশ রেগে গিয়েছিলেন তোমার আরেকটা স্যাটাসে তুমি লিখেছিলে এ বিষয়ে। কবিতাকে কোবতে বলার কি কারণ?

উপল বড়ুয়া: আমি অনেকটা নেগেটিভ ক্যারেক্টারের লোক। প্রচলিত অনেক কিছুই নিতে পারি না। এই নয় যে আমি চরম প্রগতিশীল। ‘কোবতে’ শব্দটা আমার না। শব্দটা বহুল চর্চিত ও বহু পুরানো। নব্বইয়ের দিকে শব্দটা ব্যাপক জনপ্রিয়তা পাইছিল। ‘কোবতে’ বিদ্রুপাত্মক। কয়েকদিন আগে আমি আরেকটা স্যাটায়ার বানাইছি। কাউরে নিয়ে বিদ্রুপ করতে ইচ্ছে হইলে ডাকি, ‘প্রথম আলোর কবি।’

চতুর্থ পর্ব: ঝড়ের নিমন্ত্রণে… (এখানে একটা প্রশ্নের দুটা উত্তর থাকবে যেকোনো একটা বেছে নিতে হবে)

প্রশ্ন- প্রিয় শহর: ঢাকা/ চট্টগ্রাম

উপল বড়ুয়া: চট্টগ্রাম

প্রশ্ন- নিজের প্রিয় বই: কানা রাজার সুড়ঙ্গ/ উইডের তালে তালে কয়েকজন সন্ধ্যা

উপল বড়ুয়া: উইডের তালে তালে কয়েকজন সন্ধ্যা

প্রশ্ন- কবিতা/গল্প

উপল বড়ুয়া: কবিতা

প্রশ্ন- সিন্ডিকেট/একলা চলোরে

উপল বড়ুয়া: একলা চলোরে

প্রশ্ন- সিগরেট/চা

উপল বড়ুয়া: সিগারেট

প্রশ্ন- প্রিন্ট পত্রিকা/ব্লগজিন

উপল বড়ুয়া: প্রিন্ট পত্রিকা

শেষ পর্ব: হাঁটার দূরত্ব…

তোমার জন্য একটা বিশাল চমক আছে। তোমার একজন খুব কাছের বন্ধু তোমার সম্পর্কে ওয়াকিং ডিসট্যান্স এর ওপেন উইন্ডোতে কমেন্ট জানিয়েছে।

সুমিতাভ অপু: উপল কি ভালো ফুটবল খেলতো, আমার মনে হয় সে লেখালেখি না করে ফুটবল খেলাটা চালিয়ে যেতে পারত ভালো হতো। উল্লেখ্য যে উপলের গ্রাম থেকে অনেক ফুটবলার প্রতিবছর বাংলাদেশ এর লিগ গুলোতে খেলে। এর ধারাবাহিকতায় আমাদের রামু বাইপাসে কিন্তু ফুটবলের স্তম্ভ তৈরী করা হয়েছে। ফুটবল কিন্তু উপলের গ্রামের ঐহিত্য।

ওয়াকিং ডিসট্যান্স: অসংখ্য ধন্যবাদ এবং কৃতজ্ঞতা উপল বড়ুয়া এতোটা সময় দেয়ার জন্য ওয়াকিং ডিসট্যান্স এর ওপেন উইন্ডোতে। আরও অনেক কথা বাকি থেকে গেলো। নিশ্চয়ই পরবর্তী কোনো একদিন আবার কথা হবে তোমার সঙ্গে… ভালো থাকো… নিরন্তর অভিনন্দন…

 

মন্তব্য ও পাঠ প্রতিক্রিয়া

ওয়াকিং ডিসট্যান্স এবং এর প্রকাশনা নিয়ে আপনাদের মন্তব্য ও পাঠপ্রতিক্রিয়া জানান এই পোস্টের কমেন্ট বক্সে…

উপল বড়ুয়া

দুনিয়া কীভাবে পাল্টাইতেছে তা আপনি বুঝবেন ক্যামনে…

 

মনে করেন, আপনে একজন আপিস কর্মী। প্রথমত এবং শেষতকও। প্রতি সকালে চকবাজারস্থ গুলজার মার্কেট হইতে আপনারে যাইতে হয় চট্টগ্রাম মেডিকেল মেইন গেইট। রিশকা সহযোগে। সপ্তাহে ছ’দিন। এই দুই কিলোমিটারের ভাড়া অংকে বিশ টাকা।

আপনি বলতেছেন—যাইবেন?

“রিশকা”

ছবি: ওয়াকিং ডিসট্যান্স

রিশকাঅলা—

—হতো?

—বিশ।

এভাবে যাচ্ছেন আপনে প্রথম মাস। দুই মাস। তিনমাস। ভাড়া বিশ টাকা মাত্র। মুখস্ত। আপনার ও রিশকাঅলার। রিশকা মারফৎ।

তারপর হঠাৎ একদিন; তিনমাস পর সকালে তাড়াহুড়া খুব।

—যাইবেন?

—অ

—হতো?

—পঁচিশ।

—প্রত্যিদিন তো বিশে যাই!

প্রত্যদিন দুনিয়া একতালে ন চলে।

আপনে কাঁচুমাচু হইলেন। রাগও ঝাড়লেন কয়েকবার। সারি সারি দাঁড়ানো রিশকা আপনার দিকে তাকাইয়া খলখল হাসলো। আপনারে পাত্তা দিল না কোন রিশকাব্যাটা। আপনার শরম আইল। কষ্ট হইল। আপনার মনে পড়লদেশে বিদ্বানের দাম নাই। মাছঅলার কাছে জিম্মি তরকারী বিক্রেতা। তরকারী বিক্রেতার কাছে রিশকাঅলা। ঘটনা একই। হুবহু। সুতরাং উপায় না পাইয়া আপনারে চড়িতে হইল রিশকায়। রিশকা আপনারে চড়াইল। রিশকায় চড়া যেহেতু আপনের অভ্যেস।

এভাবে পঁচিশ টাকায় আপনে যাইতেছেন প্রথম মাস। দুই মাস। তিনমাস। ভাড়া পঁচিশ টাকা মাত্র। অংকে ও কথায়। মুখস্ত। আপনার ও রিশকাঅলার। যাইতে যাইতে দেখেতেছেন ভুঁড়ি ও কর্মের চাপ বাড়তেছে। স্যালারি বাড়ে না। যাইতে যাইতে আপনার চোখে পড়ল মেডিকেলের পাশে আরেকটা বিরাট মেডিকেল। ফ্রক ছেড়ে মেয়েরা বাওয়া যাইতেছে। ডাক্তার পি.কে. দাশের সাইনবোর্ডে যুক্ত হইছে আরও কয়েকটা ডিগ্রী। এসব আপনার খেয়ালে আসে নাই এ্যাদ্দিন। আপনে জীবনে আছেন। কিন্তু আপনের সুখও নাই। দুঃখও নাই। আপনে বাঁইচা আছেন একভাবে।

তারপর হঠাৎ একদিন; চারমাস পর সকালে তাড়াহুড়া খুব।

—যাইবেন?

—অ

—হতো?

—ত্রিশ।

—প্রত্যিদিন তো পঁচিশে যাই!

প্রত্যদিন প্যাডেল হাতে মারি। আইজ ঘুরামু ঠ্যাঙে

তারপর সিদ্ধান্তে আইলেন দুনিয়া চেইঞ্জ হইতেছে এবং সাথে আপনেও। বুঝলা দুচির ভাই?

সাম্য রাইয়ান

আমাদের আড্ডাগুলো

 

২০০৬ সাল। আমি তখন গভর্নমেন্ট হাই স্কুলের ছাত্র। টুকটাক লেখালিখির চেষ্টা করছি। চলছে লুকিয়ে-চুপিয়ে পাঠ। রকিব হাসান, সেবা প্রকাশনীর তুমুল ভক্ত। একসময় জানতে পারলাম, শুধু আমিই না, এইরকম পড়–য়া আরও আছে ক্লাসে। শুরু হলো বই আদান-প্রদান। আমি, ছোয়াদ রহমান, মুশফিক আর দিগন্ত কোঙ্গর; সবচেয়ে বেশি বই সংগ্রহে ছিলো এই চারজনের। ফলে আমাদের চারজনের মধ্যেই আদান-প্রদান হতো বেশি। কিন্তু কিছুদিন যেতে না যেতেই সার্কেল বড় হতে থাকলো। একটি বই কত হাত ঘুরে যে মালিকের হাতে পৌঁছত! কখনও বই ছিঁড়ে যেত। আর এ নিয়ে চলতো মনমালিন্য। কিন্তু তারপরেও বই বিনিময় থেমে ছিলো না। এই সময় সার্কেলে সরব অংশগ্রহণ ঘটে মাহমুদুল হাসান, নাফিস সাদিক মৃদুল, এবং মাসুদ রহমান সহ আরও কয়েকজন বন্ধুর। সকলে মিলে আমরা এক বিশাল সার্কেল। এই সার্কেলের বই বিনিময় ঘটতো ক্লাসরুমের ভিতরেই।

এভাবে চলতে চলতে একদিন খোঁজ পেলাম ছোয়াদ রহমানও টুকটাক লিখতে চেষ্টা করছে। ওর স্বপ্ন রকিব হাসানের মতো গোয়েন্দা গল্প লিখবে। মুশফিকেরও একই স্বপ্ন। এর মধ্যে মাসুদ রহমানের স্বপ্ন ছিলো ভিন্ন, ট্র্যাজেডিক প্রেমের উপন্যাস লেখার। সাথে আরও দু-একজন জুটে গেল, তারাও লেখালিখির চেষ্টা করছে। ফলত আমরা যারা লেখালিখি করি তাদের আর এক ছোট্ট সার্কেল তৈরি হল। ক্লাসের ফাঁকে আমরা লেখালিখি নিয়ে কথা বলি। ক্লাস শেষে কখনও ধরলা নদীর পাড়ে নিজেদের লেখা একে অপরকে পাঠ করে শোনাই আর লেখাগুলির দিকে তাকিয়ে ভাবি, এই কুড়িগ্রাম শহরে এমন কেউ কি নেই, যিনি আমাদের পরামর্শ দিতে পারেন; এই লেখাগুলি নিয়ে আমরা কী করবো! আমরা হন্যে হয়ে খুঁজতে থাকি কুড়িগ্রামের কবি-লেখক-সম্পদকদের। কিন্তু কাউকেই খুঁজে পাই না। আড্ডা কিংবা সাহিত্যপত্র কোনোটিরই দেখা মেলে না। তখন আমরা সিদ্ধান্ত নেই নিজেরা পত্রিকা প্রকাশ করবো। তৎকালীন কুড়িগ্রাম জেলা ছাত্র ইউনিয়নের সাংগঠনিক সম্পাদক রাশেদুন্নবী সবুজের উৎসাহ ও সার্বিক সহযোগিতায় এবং আমার সম্পাদনায় ২০০৬ -এ প্রকাশিত হয় বিন্দুর প্রথম সংখ্যা; যার প্রকাশনা এখনও অব্যাহত। ওই সংখ্যাটি প্রকাশের পর আমাদের সাথে শহরের আরও কয়েকজন তরুণের পরিচয় ঘটে। আমাদের মিলিত হবার সবচেয়ে উপযুক্ত স্থান ছিলো ধরলা নদীতীর। ওখানেই চলতো আড্ডা। ২০০৭-০৮ এর দিকে ক্রমান্বয়ে সেই আড্ডায় যুক্ত হয় নেয়ামুল ইসলাম, শুভ্র সরখেল, শাওন আহমেদ প্রমূখ।

এই আড্ডাটি আমবাড়ি ঘাটেও বসতো। এখানে অবশ্য নিয়মিত অংশগ্রহণ ছিলো আমাদেরই বন্ধু সোহেল, সুমন এবং মামুনের। এরা লেখালিখির সাথে যুক্ত না থাকলেও এই আড্ডায় সবসময়ই উপস্থিত থাকতো। আড্ডায় আমরা একের পর এক নিজেদের লেখা কবিতা/গল্প পাঠ করতাম, আলোচনা করতাম। সেই সাথে বিভিন্ন বই ও লিটলম্যাগ নিয়ে আলোচনা চলতো। আলোচনার বিষয় ছিলো অনির্দিষ্ট, কোনও নিয়মের বালাই ছিলো না।

পরবর্তীতে এই আড্ডায় ভাটা পড়ে। ততদিনে আমার সাথে কুড়িগ্রামের অধিকাংশ কবি-লেখকেরই পরিচয় ঘটেছে। এর মধ্যে একটা সার্কেলের কথা উল্লেখ করি, যেখানে ছিলেন সাজেদুল ইসলাম সাজু (বর্তমানে সিপিবির সাথে যুক্ত; ঐ সময়ে গল্প অনুবাদ করতেন, কয়েকটি কবিতাও লিখেছিলেন; আবৃত্তি করতেন; আর প্রচুর পড়তেন।), মাহফুজুল ইসলাম শামীম (কুড়িগ্রাম সরকারি মহিলা কলেজে শিক্ষকতা করতেন, প্রবন্ধ লিখতেন; বর্তমানে সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা।), তুহিন ওয়াদুদ (কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজে শিক্ষকতা করতেন; বর্তমানে রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন।), ইউসুফ আলমগীর (কবিতা লিখতেন, সাহিত্যপত্র সম্পদনা করতেন; বর্তমানে সাংবাদিকতা করছেন।), মাইকেল রবিন সরকার (কবিতা লিখতেন, সাহিত্যপত্র সম্পাদনা করতেন; বর্তমানে খ্রিস্টান মিশনারী স্কুলে শিক্ষকতা করছেন।), তারিফ হক (অনেক কিছু করার পরিকল্পনা এবং কিছু কিছু চেষ্টাও করেছেন; বর্তমানে কবিতা লিখছেন।), তারেক (আবৃত্তি শিল্পী)। আরও দুই-একজন ছিলেন এই সার্কেলে যাদের কথা এই মুহূর্তে মনে পড়ছে না। এই সার্কেলের আড্ডাস্থল ছিলো কুড়িগ্রাম বিজয় স্তম্ভের পেছনে এরশাদ মামার চায়ের দোকান। এখানে ক্রমান্বয়ে শহরের উল্লেখ সংখ্যক সাহিত্য-সংস্কৃতিকর্মীগণ আড্ডা দিতে শুরু করলে এই জায়গাটি ‘পণ্ডিত-চত্ত্বর’ বলে পরিচিত হতে শুরু করে। এই আড্ডায় আলাপ-আলোচনা হয়েছে, তর্ক-বিতর্ক হয়েছে, মনোমালিন্য হয়েছে, ভালোবাসা হয়েছে, সাহিত্যপত্র প্রকাশিত হয়েছে, অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা হয়েছে; এমনকী আন্দোলনের পরিকল্পনা এবং বাস্তবায়নও হয়েছে। কুড়িগ্রামে আন্তঃনগর রেল চালুর জন্য প্রথম যে আন্দোলন কমিউনিস্ট পার্টি শুরু করেছিলো তার পরিকল্পনাও এখানেই করা হয়। যার প্রধান উদ্যোক্তা ছিলেন সাজেদুল ইসলাম সাজু। এই আড্ডা তুলনামূলক অনেকদিন স্থায়ী হয়েছিলো। কিন্তু জীবিকা প্রশ্নে অনেককে কুড়িগ্রাম ছাড়তে হলে এই আড্ডাও স্থবির হয়ে পড়ে। একসময় ফুটপাত ফাঁকা করার নামে এইসব চায়ের দোকান উচ্ছেদ করতে এই আড্ডাটি বিলুপ্ত হয়ে যায়।

 

সাম্য রাইয়ান’র আড্ডাগুলো

“আড্ডা” ছবি: ওয়াকিং ডিসট্যান্স

২০১০ -এ আমরা কয়েকজন পরিকল্পনা করে আড্ডার ব্যবস্থা করি। এই আড্ডার মেয়াদ ছিলো ১১ মাস। এই ১১ মাস প্রায় প্রতিদিন গর্ভমেন্ট হাই স্কুলের পুকুরপাড়ে আমাদের আড্ডা বসতো। এই আড্ডার রূপ ছিল খানিকটা ভিন্নতর। এখানে প্রতিদিন নির্দিষ্ট বইয়ের নির্বাচিত অংশ পাঠ করা হতো এবং চলতো আলোচনা। তারপরে স্বরচিত লেখা পাঠ ও আলোচনা। এবং সবশেষে লাল চা খাওয়া। এই আড্ডায় সাজেদুল আসলাম সাজু, মোকলেছুর রহমান, নেয়ামুল মিহাদ, নেয়ামুল ইসলাম, কবি শুভ্র সরখেলসহ প্রায় ২০-২৫ জন তরুণ নিয়মিত উপস্থিত থাকতো। এই আড্ডা থেকে ‘পদাতিক’ নামে ভাঁজপত্রের কয়েকটি সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছিলো।

এই সময়ের বছর খানেক আগে আরেকটি স্থানে আমাদের আড্ডা জমে ওঠে; ফায়ার সার্ভিসের উল্টোদিকে সোহাগের চায়ের দোকান। এটি ছিলো তরুণ-অতি তরুণ কবি-লেখক-বিপ্লবীদের আড্ডা দেয়া আর লুকিয়ে সিগারেট খাওয়ার এক অনন্য জায়গা। এখানে নিয়মিত উপস্থিত থাকতো শুভ্র সরখেল, গৌতম কুমার, নেয়ামুল ইসলাম, নেয়ামুল মিহাদ সহ আরও অনেক তরুণ, যাদের সবার নাম আজ আর মনে নেই। দীর্ঘদিন এখানে আড্ডা জমেছিলো। বর্তমানে এই দোকানটি নেই। দোকানের মালিক সোহাগ এখন বৈদ্যুতিক মিস্ত্রী। আমরা যখন বসতে শুরু করি তখন এইখানে প্রায় তেমন কেউ বসতো না; অধিক সময় ফাঁকাই থাকতো, আর মূল ভোক্তা ছিলো দোকানের সামনের বস্তির হরিজন সম্প্রদায়। কিন্তু আমরা বসতে শুরু করার পর এইখানে এত বেশি লোক সমাগম হলো যে, দোকানের জায়গা বৃদ্ধি করতে হলো, নতুন বেঞ্চ ও টেবিল যুক্ত করতে হলো। সোহাগের সাথে আমাদের তিনজনের (আমি, শুভ্র সরখেল, নেয়ামুল ইসলাম) এমনই সম্পর্ক ছিলো যে, আমরা ওঁর বিয়েতে বরযাত্রী হিসেবে গিয়েছিলাম। আমরা না যাওয়ার জন্য চেষ্টা করায় সোহাগের বাবা-মা দেড় ঘন্টা বিয়ের গাড়ি নিয়ে আমাদের জন্য অপেক্ষায় ছিলো। আর বলেছিলো, আমরা তিনজন না গেলে বরযাত্রী যাবে না। অবশেষে আমরা বরযাত্রী হিসেবে যাই এবং সারারাত একসাথে হৈ-হুল্লোর করে অনন্য সময় পার করি। এর মধ্যে আমি ঢাকা চলে যাই আর ফিরে এসে দেখি সোহাগের দোকান বন্ধ হয়ে গেছে!

কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারের বাম দিকে পাশাপাশি দু’টি চায়ের দোকান ছিলো। দু’টিই ভাঙাচোরা; আলাদা করে কোনও কর্মচারী ছিলো না; এখানে মালিকই একমাত্র কর্মচারী। এই দু’টি চায়ের দোকানকে কেন্দ্র করেও গড়ে ওঠে কবি-সাহিত্যিকদের আড্ডা। এর একটি ছিলো রুবেলের চায়ের দোকান, অপরটি শহিদুল ভাইয়ের চায়ের দোকান। এইসব দোকানে দিন কিংবা রাত, চলতো ঘন্টার পর ঘন্টা আড্ডা, কবিতাপাঠ। এখানে আমরা প্রায় প্রতিদিনই বসতাম; ছিলেন ছাত্র ইউনিয়নের নেতা মোকলেছুর রহমান, নিরঞ্জন চন্দ্র রায়, গল্পকার জুলকারনাইন স্বপন, কবি মাহফুজুর রহমান লিংকন, ছাত্র ফ্রন্ট নেতা গৌতম কুমার সহ অনেক তরুণ লেখক ও সংস্কৃতিকর্মী। রুবেলের মা বাড়িতে লাল চা বানিয়ে দিতেন আর রুবেল ফ্লাস্কে সেই চা নিয়ে এসে দোকানে বিক্রি করতো।

আরেকটি দোকানের মালিক শহিদুল ভাই হোটেল শ্রমিক ইউনিয়নের নেতা। আমাদের আড্ডা শুনে উনি বেশিক্ষণ দূরে থাকতে পারতেন না; দ্রুত হাতের কাজ সেরে এসে পাশে বসে কথা শুনতেন, কখনো বা অংশগ্রহণ করতেন। আর মাঝেমধ্যে অনেক জোর করলেও আমাদের চায়ের বিল নিতেন না। বলতেন, “এইটা আমি খাওয়াইলাম, আপনারাও তো মানুষের জন্য কতো কী করেন, তার তো বিল নেন না। আমি আর কী এমন খাওয়াইলাম; এক কাপ চা-ই তো।…”

এই দু’টি চায়ের দোকানের একটিও এখন আর নাই। জেলা পরিষদ সৌন্দর্য বর্ধনের নামে এই দুটিও উচ্ছেদ করেছে! রুবেল এখন অন্যের অটোরিকসা চালায়। আর শহিদুল ভাই অন্যের হোটেলে আবার কখনও বিয়ে বাড়িতে রাঁধুনীর কাজ করেন।

ঐ সময়েরই কথা, আরেকটা দারুণ আড্ডা জমে উঠেছিলো কেন্দ্রীয় কবরস্থানের সামনে কুলি শ্রমিকদের জন্য নির্মিত বাঁশের টঙে। এই আড্ডা বসতো সাধারণত রাত ৮টার দিকে। এই আড্ডার পথিকৃৎ বলা যায় জুলকারনাইন স্বপনকে। স্বপন ভাই আড্ডাপ্রিয় মানুষ। গল্প বলায় ওস্তাদ। প্রথমদিকে উনি একাই টঙে বসে থাকতেন। ক্রমান্বয়ে আমরা এক-দুই করে বসতে বসতে সেখানেও শুরু হলো তুমুল আড্ডা। সামনেই ছিলো একটিমাত্র খোলা চায়ের দোকান; দোকানের একমাত্র অবলম্বন ছিল একটি বাক্স, যার শরীরে বড় করে লেখা ছিলো ‘মোকছেদ টি স্টল’। এই দোকান থেকে আসতো লেবু চা। দীর্ঘ রাত পর্যন্ত চলা এই আড্ডায় নিয়মিত মুখ ছিলেন সাজেদুল ইসলাম সাজু, মাইকেল রবিন সরকার, রুকুনুজ্জামান রুকু (বাসদ নেতা), মোকসেমুল ফাহিম (বাসদ কর্মী), শুভ্র সরখেল। মাঝেমধ্যে আসতেন ইউসুফ আলমগীরসহ আরও কেউ কেউ। সাধারণত রাত্রি ১১টার মধ্যে অধিকাংশ আড্ডারুগণ চলে গেলে অবশিষ্ট থাকতেন জুলকারনাইন স্বপন, মাইকেল রবিন সরকার, মাহফুজুর রহমান লিংকন, সাজেদুল ইসলাম সাজু, শুভ্র সরখেল, কখনো বা মোকলেছুর রহমান; আমরা রাত্রি ১২ টা বা ১ টা পর্যন্ত আড্ডা দিয়ে তারপরে বাড়ি ফিরতাম।

একবার তো এমন হলো, আড্ডা দিয়ে সবাই চলে যাবার পর আমি, মাহফুজুর রহমান লিংকন আর জুলকারনাইন স্বপন, তিনজন ভাবছিলাম কিছুক্ষণ কথা বলে উঠি। এরপর আমরা বুঝতেই পারিনি সময় কীভাবে চলে গেছে! হঠাৎ শুনি মসজিদে আযান হচ্ছে। আমরা হতভম্ব! এ-ই-র-ক-ম জমজমাট আড্ডা হতো এইখানে। পৌরসভার উচ্ছেদের কবলে পড়ে এই আড্ডাও বন্ধ হয়ে যায়!

টঙটি তুলে দেয়ায় কবরস্থান আর ঘোষপাড়ার মধ্যবর্তী ওহাবের চায়ের দোকানে আমাদের আড্ডা শুরু হয়। আগের মতো জমজমাট না হলেও এখনও আমরা কেউ কেউ এখানেই আড্ডা দিই। আগের আড্ডারুগণ অধিকাংশই শহরে নাই; জেলার বাইরে থাকেন বিভিন্ন প্রয়োজনে। তাই শহরে সাহিত্য আড্ডা স্তিমিত। তবে ধর্মীয় ছুটিগুলোতে হঠাৎ করেই জমে ওঠে শাপলা চত্তর এলাকা, ওহাবের দোকান, আমাদের আড্ডাস্থল…।

পুরাতন শহরে পুরাতন পোস্ট অফিসের সামনে একটি অতি পুরোনো এবং পরিচিত চায়ের দোকানের নাম ‘তুলশী’। এখানে অধিকাংশ সময় অতি অগ্রজগণ আড্ডা দেয়ায় তরুণদের উপস্থিতি সীমিত। বলে রাখি, এই দোকানেই একদিন আড্ডা চলাকালে মাহফুজুর রহমান লিংকনের সাথে আমার পরিচয় ঘটে, মাইকেল রবিন সরকারের উপস্থিতিতে।

এখানে নিয়মিত আড্ডা দিতেন প্রয়াত অধ্যাপক তপন রুদ্র (সম্পাদক: অক্ষর; কাব্য, উপন্যাস, প্রবন্ধ গ্রন্থ রচয়িতা।)। অন্যান্যের মধ্যে এখানে দেখা মেলে কবি আশীষ বকসী, সংস্কৃতিকর্মী ও সাংবাদিক শ্যামল ভৌমিক, কবি হেলাল জাহাঙ্গীর, দেলোয়ার হোসেন মঞ্জু (নাট্যকর্মী), শাহানুর রহমান (সংস্কৃতিকর্মী), ইমতে আহসান শিলু (সংস্কৃতিকর্মী ও সাংবাদিক), জুলকারনাইন স্বপনসহ প্রমূখ ব্যক্তিবর্গের।

ভাষা আন্দোলন এবং পরবর্তীতে মুক্তিযুদ্ধ পার করে এই দোকান এখনও তার পুরোনো চেহারাতেই বহাল রয়েছে। দিনে দিনে আড্ডারুগণ পরিবর্তন হলেও এই দোকানের তেমন কিছুমাত্র পরিবর্তন ঘটেনি। যুগের পর যুগ বিভিন্ন প্রজন্মকে নির্দ্বিধায় ধারণ করে চলেছে এই তুলশী দোকান। শুনেছি একসময় কুড়িগ্রামের প্রথিতযশা কবি, লেখক, বিপ্লবী, সাংবাদিক, খেলোয়ারদের প্রধানতম আড্ডাস্থল ছিলো এটি।

আরেকটি হোটেলে আমাদের আড্ডা জমে উঠতো ‘চাইনিজের হোটেল’। শহিদ মিনারের ডান দিকে এই হোটেলটিতে আমরা প্রায়ই ঘন্টার পর ঘন্টা আড্ডা দিয়েছি। এই হোটেলের মালিক চাইনিজের ছিলো ভবঘুরে মন। টঙের আড্ডারুগণই এখানে উপস্থিত থাকতো। চাইনিজ ভাত বিক্রি করলেও কখনও ভাত খাওয়া হয়ে ওঠেনি এখানে। প্রায়ই চাইনিজ আমাকে আড়ালে ডেকে বলতো, “সাম্য দা, দ্যান তো একশটা টাকা; দোকান-টোকান ভাল লাগে না বাল, একটু ঘুরি আসি।”

চাইনিজ সেই হোটেল অন্য এক ব্যবসায়ীর কাছে হস্তান্তর (সম্ভবত বিক্রি) করেছে। এরপর এক মাসের মতো ফুটপাতে চায়ের দোকান দিয়েছিলো। বলতো, “বুঝলেন সাম্য দা, অত বড় হোটেলের মালিক ছিলাম, আমার কি এইসব চায়ের কেটলি ধোয়া মানায়, আপনিই কন?” ফুটপাতের দোকান বন্ধ করে ভাগ্য বদলাতে সেই চাইনিজ কিছুদিন ঢাকায় দিনমজুরিও করেছিলো! কিন্তু ভাগ্যের বদল ঘটেনি। কুড়িগ্রামের টানে আবার ফিরে এসেছে। শাপলার সেই ফুটপাতে এখন চাইনিজের নতুন চায়ের দোকান।

হোটেল আমন্ত্রন। মালিকের নাম মৃণাল ঘোষ হওয়ায় লোকে বলতো ‘ঘোষের হোটেল’। চাইনিজের দোকান বন্ধ হবার কিছু আগে থেকে এই হোটেলে প্রায় ২/৩ বছর জমিয়ে আড্ডা হয়েছে। প্রায় নিয়মিতই এখানে আসতেন জুলকারনাইন স্বপন, মৌসুমী রহমান বুবলী (নাট্যকর্মী), রুকুনুজ্জামান রুকু, মাইকেল রবিন সরকার। মাঝে মাঝে দেখা পাওয়া যেত মোকলেছুর রহমান, সেলিম সেতু (অ্যাডভোকেট), রাই বাবু, বাবলু, ইলিয়াডসহ প্রমূখ ব্যক্তিবর্গের। এই আড্ডায় শিল্প-সাহিত্য ও রাজনীতি ব্যতিত তেমন কোনও কথা হতো না। এখানে চা তেমন ভাল হতো না। আমরা প্রায় কেউই এখানকার চা পছন্দ করতাম না। কিন্তু হোটেলটি অনেক বড় জায়গাজুড়ে ফাঁকা পড়ে থাকায় আমাদের দীর্ঘসময় আড্ডা দেয়ার উপযুক্ত স্থান বলেই বিবেচিত ছিলো। পরবর্তীতে এখানে বসার মতো পরিবেশ নষ্ট হয়ে যাওয়ায় আমাদের দুই-একজন ব্যতিত আর সকলেই এখানে বসা বন্ধ করে দিয়েছিলো। এই হোটেলটিও এখন আর নেই। মৃণাল ঘোষ হোটেলটি বন্ধ করে দিয়েছেন।

এইসবের বাইরেও চলে আড্ডা। অনেকে নিজেদের মতো করে অনেক জায়গায়ই আড্ডা দেয়; কেউ এক বা দুইজন চায়ের দোকানে, প্রেসক্লাবে, বাবুল চশমা ঘরে, কোনও সংবাদকর্মীর কার্যালয়ে কিংবা অন্য কোথাও…। ২০১৭ -এ অবশ্য দেখা যাচ্ছে দুই-তিনটি ছোট গ্রুপ আয়োজন করে, ঘোষণা দিয়ে আড্ডা দিচ্ছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ফরমাল আড্ডাটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন ইউসুফ আলমগীর ও লাইলী বেগম; উভয়ই পোশায় সাংবাদিক। কুড়িগ্রাম প্রেসক্লাবে অনুষ্ঠিত এই আড্ডাটিতে শুনেছি কতক নবীনের যাতায়াত আছে। এই আড্ডা থেকে ট্যাবলয়েডের অর্ধেক আকৃতির একটি পত্রিকা প্রকাশিত হয়।

নিকট অতীতে এরকম ফরমাল আড্ডা সংঘটনের ইতিহাস আছে কুড়িগ্রামের বিলুপ্ত দু’টি স্থানীয় সাহিত্যিকদের সংগঠনের; ‘তরুণ লেখক ফোরাম’ এবং ‘চন্দ্রবিন্দু’। এঁদের আড্ডা ছিলো কলেজ মোড়স্থ সাধারণ পাঠাগার এবং রিভার ভিউ উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনে পাবলিক লাইব্রেরী।

মোরাল অব দ্য স্টোরি

আরবান কালচারের এক অশোভন রূপ, বাসিন্দারা নিজের শহরকে আর আপন ভাবতে পারে না। নিজের বাড়িতে থেকেও মানসিকভাবে নিজেকে ভাড়াটিয়া ভাবতে শুরু করে। ঢাকা সেই ভয়াবহতার নির্মম শিকার হয়েছে, বাংলাদেশের মনোরম মফস্বলগুলোও সেই পথে এগুচ্ছে! কুড়িগ্রাম শহরে এখন আড্ডা দেয়ার মতো, কলেজ মোড়ে, ফুটপাতে, শাপলা চত্ত্বরে চায়ের দোকান প্রায় নেই বললেই চলে। সৌন্দর্য বর্ধনের নামে আড্ডস্থল/চায়ের দোকান উচ্ছেদ করে পরিকল্পনাহীনভাবে ভবন-দালান তৈরির মাধ্যমে এই শহরকে প্রাণহীন এক যান্ত্রিক শহরে রূপান্তরিত করা হচ্ছে। যেভাবে ঢাকায় ছবির হাটের আড্ডা বন্ধ করা হয়েছে, টিএসসির আড্ডা সংকুচিত করা হয়েছে; একইভাবে, শুধু কুড়িগ্রাম নয়, সারা দেশে সাহিত্যিক-সংস্কৃতিকর্মীদের আড্ডাস্থলগুলো নানা অযুহাতে ধ্বংস করার প্রক্রিয়া অনেকদিন ধরেই চলছে।

সংগঠনের ফরমাল আড্ডা সাহিত্যের জন্য তেমন ফলপ্রসূ কিছু বয়ে আনতে পারেনি কখনও। বরং এসব থেকে জন্ম নিয়েছে হিংসা, কলহ, নোংরামি, দলাদলি, এমনকী হাতাহাতি-মারধরের ঘটনাও! সাহিত্যের জন্য সবসময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে চায়ের দোকান। সাহিত্য সংগঠনের নেতা নয়, আমাদের বরং কৃতজ্ঞ থাকা উচিত সেইসব চায়ের দোকানের প্রতি, যারা ব্যবসার ক্ষতি করেও ঘন্টার পর ঘন্টা আমাদের আড্ডার সুযোগ করে দিয়েছেন। আমি তাঁদের শ্রদ্ধা করি।

 

 

তানজিন তামান্না

সমকাম প্রকৃতি বিরুদ্ধ কোনো আচরণ নয়…

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

সমকামকে সমাজে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নভাবে দেখা হয়েছে। এর পেছনে কাজ করেছে বিভিন্ন প্রেক্ষিত ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি। সমকামের বিপক্ষে যেমন থেকেছে মানুষ, তেমন পক্ষেও থেকেছে। তবে সমকামের বিরুদ্ধে অবস্থান করতেই বেশী দেখা গেছে এবং যাচ্ছে সমাজকে। আইন, ধর্ম, সমাজের মানুষের নানারকম দৃষিভঙ্গি রয়েছে সমকাম নিয়ে। এর জন্য বিভিন্ন সময় সমকামিদের নানারকম নিপীরনের ভেতর দিয়ে যেতে হয় যা কিনা তাদের মানবিক আচরণ এবং মৌলিক অধিকারকে লঙ্ঘন করে।
ইউরোপ ও আমেরিকার মতো জায়গায় সমকামকে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে এবং সমকামিদের স্বাভাবিক জীবন যাপনকে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। সাম্প্রতিক দীর্ঘ কয়েক বছর সমকামিদের আন্দোলনের পর ভারতের শীর্ষ আদালত আইনের ৩৭৭ ধারার অবসান করে সমকামিদের পক্ষে রায় দিয়েছে। সমকামিদের পক্ষে ভারতের এমন রায়কে অভিনন্দননের দাবী রাখে। এখনও আমাদের বাংলাদেশে সমকাম একটি নিষিদ্ধ বিষয়। এটি শুধু নিষিদ্ধ বিষয়ই নয় সমাজে এটি একটি উপেক্ষিত বিষয়ও। এর পেছনে কাজ করছে সমাজের মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি যা কিনা প্রচলিত ধ্যান-ধারণা এবং প্রচলিত সিস্টেমের কারণে সৃষ্ট। এমন বিরূপ পরিস্থিতির মধ্যেও নানারকম ঝুঁকি নিয়ে সমকামিদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করে যাচ্ছে বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রগতিশীল ও বিজ্ঞানমনস্ক মানুষ। হয়তো এমন একদিন আসবে যেদিন বাংলাদেশে সমকামিরাও বিপরীতকামিদের মতো সমাজে স্বাভাবিকভাবে জীবন যাপন করতে পারবে…
সমকাম এটা কোনো মনস্তাত্বিক বিকারগ্রস্ততা নয় যা আমাদের সমাজের মানুষ ভেবে থাকে। বরং সমকাম একটি ন্যাচারাল যৌনাচরণ যার পেছনে রয়েছে জীব-বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা। মানুষের জিনগত বৈশিষ্ট। মানুষ ছাড়াও প্রাণী জগতের অন্যান্য প্রাণীদের মধ্যেও সমকামি যৌন আচরণ পরিলক্ষিত হয়েছে।
একজন মানুষ তার একই লিঙ্গের মানুষের প্রতি স্বাভাবিকভাবেই যৌন আকর্ষণ অনুভব করে থাকে। নিশ্চয় এটা বিপরীতকামিদের প্রেমের মতোই একটি স্বাভাবিক প্রেম। এটা সমকামিদের একটি মানবিক আচরণ। অথচ এর জন্য তাদের সহ্য করতে হয় বিভিন্ন নির্যাতন যা কিনা তাদের মানবিক মৌলিক অধিকারকে লঙ্গন করে। সমাজের মানুষের সাথে স্বাভাবিকভাবে চলাফেরার অধিকার তাদের আছে। কিন্তু প্রতিনিয়ত তাদের গোপনীয়তা রক্ষা করে চলতে হচ্ছে। অবশ্য বাংলাদেশের মতো দেশে অথবা এরকম আরও কোনো কোনো দেশে যেখানে নারী-পুরুষের বিবাহ বহির্ভূত একসাথে থাকার প্রতি সমাজের মানুষের নেগেটিভ দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে সেখানে সমকামতো অনেক দূরের ব্যাপার।
সমকামের প্রতি সমাজের মানুষের নেগেটিভ দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনের মাধ্যমেই সমকামিরা এই সমাজে অন্য সবার সঙ্গে স্বাভাবিক জীবন-যাপন করতে পারবে। সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের সমকামিদের পক্ষের এই রায় নিশ্চয়ই একটি দারুন দৃষ্টান্ত যা কিনা বাংলাদেশকে উৎসাহিত করতে পারে সমকামিদের মানবিক অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য… তবে সবচেয়ে আগে প্রয়োজন সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির উদারতা…

 

সাম্য রাইয়ান

38507129_498501387278208_7820815629866237952_n

সাম্য রাইয়ান’র আলোকচিত্র “প্রিয় ধরলা”

38660762_463651330816779_1554124376935235584_n

সাম্য রাইয়ান’র আলোকচিত্র “প্রিয় ধরলা”

38645827_1311322619004543_7708618697409036288_n

সাম্য রাইয়ান’র আলোকচিত্র “প্রিয় ধরলা”

38629986_1637973042997409_5941248141960413184_n

সাম্য রাইয়ান’র আলোকচিত্র “প্রিয় ধরলা”

38653349_1249579538516975_159151013880659968_n

সাম্য রাইয়ান’র আলোকচিত্র “প্রিয় ধরলা”

Thanks to Syad Midhad Mim…

ওয়াকিং ডিসট্যান্স এর Logo তৈরি করেছেন গ্রাফিক্স আর্টিস্ট এবং ডিজিাইনার সৈয়দ মিদহাদ মিম। তাঁকে অসংখ্য ধন্যবাদ সুন্দর ও মৌলিক একটি Logo তৈরি করে দেবার জন্য… আমাদের ওয়েবসাইট এর এড্রেস

https://walking09.wordpress.com

cropped-walking-distance-logo.jpg

ওয়াকিং ডিসট্যান্স এর Logo তৈরি করেছেন গ্রাফিক্সক্স আর্টিস্ট এবং ডিজিাইনার সৈয়দ মিদহাদ মিম।

 

 

Thanks to Navil Maandar…

“ওয়াকিং ডিসট্যান্স” এর নামটা লেখক নাভিল মানদার এর কাছ থেকে পাওয়া। নাভিল মানদার কে ধন্যবাদ এতো সুন্দর এবং প্রাসঙ্গিক একটা নাম এর ধারণা দেবার জন্য… আমাদের ওয়েবসাইটটির এড্রেস

https://walking09.wordpress.com

…কথা বলছে সেপ্টেম্বরের যশোর রোড

সেপ্টেম্বর এই মাসটি আমাদের নিয়ে যায় ১৯৭১ এর যশোর রোডে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় যে রোড ধরে শত শত মানুষ আশ্রয় নিতে চলেছিলো কলকাতায়। তাদের মানবেতর, অসহায় অবস্থা সম্পূর্ণভাবে চিত্রিত হয়েছে অ্যালেন গিন্সবার্গ এর “সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড” কবিতায়। ১৯৭১ সালে অ্যালেন গিন্সবার্গ যশোর সীমান্তে আসেন নৌপথে কারণ প্রচুর বৃষ্টির কারণে যশোর রোড পানিতে ডুবে গিয়েছিলো। যশোরের সীমান্তে এবং তার আশেপাশের শরণার্থী শিবিরগুলো প্রত্যক্ষ করে এই কবিতাটি লিখেছিলেন। পরে তাঁর বন্ধু অন্যতম গায়ক, গীতিকার ও সুরকার বব ডিলান কবিতাটিকে গান বানান এবং অন্য শিল্পীদের নিয়ে কনসার্ট করে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় শরণার্থীদের জন্য অর্থ সাহায্য করেন। “সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড” কবিতার কিছু লাইন

Millions of souls nineteenseventyone

homeless on Jessore road under grey sun

A million are dead, the million who can

Walk toward Calcutta from East Pakistan

পরে কবিতাটি বাংলায় অনুবাদ করেন খান মোহাম্মদ ফারাবী। এটিকে গান রুপে গেয়েছেন শিল্পী মৌসুমী ভৌমিক।

১৯৭১ সাল যখন পাকিস্তান বাংলাদেশের মানুষের উপর অমানবিক অত্যাচার চালায় দীর্ঘ নয় মাস ধরে শত শত মানুষ যশোর রোড ধরে তাদের বাড়ি-ঘর, নিজস্ব বাসস্থান ছেড়ে প্রাণ বাঁচাতে কলকাতার শরণার্থী শিবিরে আশ্রয়ের জন্য গিয়েছিলো। শত শত শিশু সে সময় অনাহারে দিন কাটাচ্ছিলো। যা এই কবিতার অনুবাদে লেখা হয়েছে-

“রিফিউজি ঘরে খিদে পাওয়া শিশু, পেটগুলো সব ফুলে ফেঁপে ওঠে
এইটুকু শিশু এতবড় চোখ দিশেহারা মা কারকাছে ছোটে।”

মায়েরা তখন পাগল প্রায়। অসুখ, অনাহার, ভিটে বাড়ি ছেড়ে আসার হাহাকারে নিঃস ও অসহায় শত শত মানুষ সেসময় যশোরের সীমান্ত দিয়ে কলকাতার শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নিয়েছিলো।

ছবি: সংগৃহীত

…অজানায় ঘুরে আসা

“চলোনা ঘুরে আসি অজানাতে

যেখানে নদী এসে থেমে গেছে”

এমনই একটি স্থান যেখানে গেলে নিজের  অজানায় এই গানটা মনের কোণে গুনগুন করে  ওঠে… তবে এখানে নদী কিন্তু থেমে যায়নি! বরং তার নিজস্ব ঢঙে চলতে চলতে সকলকে হাতছানি দেয়…

এই স্থানটি বাংলাদেশের রাজশাহী বিভাগের পাবনা জেলার ঈশ্বরদী উপজেলার একটি ইউনিয়ন। অসাধারণ প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যের স্থানটির নাম পাকশী, যার পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে পদ্মা নদী…

আমরা যখন পাকশী পৌঁছলাম তখন বিকেল ও সন্ধ্যার মাঝামাঝি একটা সময়। যদিও এর আগে অসংখ্যবার এখানে গিয়েছি এবং এটি আমার স্মৃতিবহুল একটি জায়গা। কিন্তু এখানে যতোবার যাই ততোবার পাকশীকে নতুনরূপে দেখা যায়! এই এর বিচিত্র  ভাব। এখানকার নদী, আকাশ, সবুজ প্রকৃতি, রাস্তা সবই যেনো এক অসাধারণ হেঁয়ালীতে সকলকে কাছে ডাকে। রহস্য আর আনন্দ এই দুই মিলে সকলের মনকে নিয়ে যায় পরাবাস্তবতার  কিনারায়!

বিভিন্ন অকেশনে নদীর তীরে বসে গ্রামীন মেলা। এটি এখানকার আরও একটি সৌন্দর্য্য। এসময় প্রচুর দর্শনার্থী ভীড় করে পাকশীতে। অনেকে নদীর তীরে দাঁড়িয়ে প্রকৃতিকে উপভোগ করে আবার অনেকে নৌকায় নদীতে ঘুরে বেড়ায়।

পাকশীর পদ্মা নদীর উপর অবস্থিত হার্ডিঞ্জ ব্রীজ আর এর অদূরেই লালন শাহ সেতু। হার্ডিঞ্জ ব্রীজ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রেলওয়ে সেতু। সেতু দুটি যেসকল পিলারের উপরে দাঁড়িয়ে আছে সেগুলো বর্ষার সময় অনেকটা নদীতে ডুবে থাকে।

পাকশী রেলওয়ে জংশনটি অসাধারণ সুন্দর। ট্রেনে যখন যাতায়াত করেছি  তখন প্রতিবারই মনে হয়েছে এই জংশনে নেমে এর অপরূপ প্রকৃতির সান্নিধ্য নেই। পাকশী সবসময় একটা হাতছানি দিতে থাকে মানুষের মনকে…

পাকশীতে যাওয়াটা খুবই সহজ। ঢাকা থেকে ট্রেন অথবা বাসে সরাসরি চলে আসা যায় ঈশ্বরদী বা পাকশী। ঈশ্বরাী থেকে অটো বা রিক্সায় করেও যাওয়া যায় পাকশী। আর পাকশী রেলওয়ে জংশনে নামলেতো কথাই নেই, নেমেই নিজেকে খুঁজে পাওয়া যাবে অজানা আনন্দের সমারোহে…

ছবি : তানজিন তামান্না