সাম্য রাইয়ান

আমাদের আড্ডাগুলো

 

২০০৬ সাল। আমি তখন গভর্নমেন্ট হাই স্কুলের ছাত্র। টুকটাক লেখালিখির চেষ্টা করছি। চলছে লুকিয়ে-চুপিয়ে পাঠ। রকিব হাসান, সেবা প্রকাশনীর তুমুল ভক্ত। একসময় জানতে পারলাম, শুধু আমিই না, এইরকম পড়–য়া আরও আছে ক্লাসে। শুরু হলো বই আদান-প্রদান। আমি, ছোয়াদ রহমান, মুশফিক আর দিগন্ত কোঙ্গর; সবচেয়ে বেশি বই সংগ্রহে ছিলো এই চারজনের। ফলে আমাদের চারজনের মধ্যেই আদান-প্রদান হতো বেশি। কিন্তু কিছুদিন যেতে না যেতেই সার্কেল বড় হতে থাকলো। একটি বই কত হাত ঘুরে যে মালিকের হাতে পৌঁছত! কখনও বই ছিঁড়ে যেত। আর এ নিয়ে চলতো মনমালিন্য। কিন্তু তারপরেও বই বিনিময় থেমে ছিলো না। এই সময় সার্কেলে সরব অংশগ্রহণ ঘটে মাহমুদুল হাসান, নাফিস সাদিক মৃদুল, এবং মাসুদ রহমান সহ আরও কয়েকজন বন্ধুর। সকলে মিলে আমরা এক বিশাল সার্কেল। এই সার্কেলের বই বিনিময় ঘটতো ক্লাসরুমের ভিতরেই।

এভাবে চলতে চলতে একদিন খোঁজ পেলাম ছোয়াদ রহমানও টুকটাক লিখতে চেষ্টা করছে। ওর স্বপ্ন রকিব হাসানের মতো গোয়েন্দা গল্প লিখবে। মুশফিকেরও একই স্বপ্ন। এর মধ্যে মাসুদ রহমানের স্বপ্ন ছিলো ভিন্ন, ট্র্যাজেডিক প্রেমের উপন্যাস লেখার। সাথে আরও দু-একজন জুটে গেল, তারাও লেখালিখির চেষ্টা করছে। ফলত আমরা যারা লেখালিখি করি তাদের আর এক ছোট্ট সার্কেল তৈরি হল। ক্লাসের ফাঁকে আমরা লেখালিখি নিয়ে কথা বলি। ক্লাস শেষে কখনও ধরলা নদীর পাড়ে নিজেদের লেখা একে অপরকে পাঠ করে শোনাই আর লেখাগুলির দিকে তাকিয়ে ভাবি, এই কুড়িগ্রাম শহরে এমন কেউ কি নেই, যিনি আমাদের পরামর্শ দিতে পারেন; এই লেখাগুলি নিয়ে আমরা কী করবো! আমরা হন্যে হয়ে খুঁজতে থাকি কুড়িগ্রামের কবি-লেখক-সম্পদকদের। কিন্তু কাউকেই খুঁজে পাই না। আড্ডা কিংবা সাহিত্যপত্র কোনোটিরই দেখা মেলে না। তখন আমরা সিদ্ধান্ত নেই নিজেরা পত্রিকা প্রকাশ করবো। তৎকালীন কুড়িগ্রাম জেলা ছাত্র ইউনিয়নের সাংগঠনিক সম্পাদক রাশেদুন্নবী সবুজের উৎসাহ ও সার্বিক সহযোগিতায় এবং আমার সম্পাদনায় ২০০৬ -এ প্রকাশিত হয় বিন্দুর প্রথম সংখ্যা; যার প্রকাশনা এখনও অব্যাহত। ওই সংখ্যাটি প্রকাশের পর আমাদের সাথে শহরের আরও কয়েকজন তরুণের পরিচয় ঘটে। আমাদের মিলিত হবার সবচেয়ে উপযুক্ত স্থান ছিলো ধরলা নদীতীর। ওখানেই চলতো আড্ডা। ২০০৭-০৮ এর দিকে ক্রমান্বয়ে সেই আড্ডায় যুক্ত হয় নেয়ামুল ইসলাম, শুভ্র সরখেল, শাওন আহমেদ প্রমূখ।

এই আড্ডাটি আমবাড়ি ঘাটেও বসতো। এখানে অবশ্য নিয়মিত অংশগ্রহণ ছিলো আমাদেরই বন্ধু সোহেল, সুমন এবং মামুনের। এরা লেখালিখির সাথে যুক্ত না থাকলেও এই আড্ডায় সবসময়ই উপস্থিত থাকতো। আড্ডায় আমরা একের পর এক নিজেদের লেখা কবিতা/গল্প পাঠ করতাম, আলোচনা করতাম। সেই সাথে বিভিন্ন বই ও লিটলম্যাগ নিয়ে আলোচনা চলতো। আলোচনার বিষয় ছিলো অনির্দিষ্ট, কোনও নিয়মের বালাই ছিলো না।

পরবর্তীতে এই আড্ডায় ভাটা পড়ে। ততদিনে আমার সাথে কুড়িগ্রামের অধিকাংশ কবি-লেখকেরই পরিচয় ঘটেছে। এর মধ্যে একটা সার্কেলের কথা উল্লেখ করি, যেখানে ছিলেন সাজেদুল ইসলাম সাজু (বর্তমানে সিপিবির সাথে যুক্ত; ঐ সময়ে গল্প অনুবাদ করতেন, কয়েকটি কবিতাও লিখেছিলেন; আবৃত্তি করতেন; আর প্রচুর পড়তেন।), মাহফুজুল ইসলাম শামীম (কুড়িগ্রাম সরকারি মহিলা কলেজে শিক্ষকতা করতেন, প্রবন্ধ লিখতেন; বর্তমানে সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা।), তুহিন ওয়াদুদ (কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজে শিক্ষকতা করতেন; বর্তমানে রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন।), ইউসুফ আলমগীর (কবিতা লিখতেন, সাহিত্যপত্র সম্পদনা করতেন; বর্তমানে সাংবাদিকতা করছেন।), মাইকেল রবিন সরকার (কবিতা লিখতেন, সাহিত্যপত্র সম্পাদনা করতেন; বর্তমানে খ্রিস্টান মিশনারী স্কুলে শিক্ষকতা করছেন।), তারিফ হক (অনেক কিছু করার পরিকল্পনা এবং কিছু কিছু চেষ্টাও করেছেন; বর্তমানে কবিতা লিখছেন।), তারেক (আবৃত্তি শিল্পী)। আরও দুই-একজন ছিলেন এই সার্কেলে যাদের কথা এই মুহূর্তে মনে পড়ছে না। এই সার্কেলের আড্ডাস্থল ছিলো কুড়িগ্রাম বিজয় স্তম্ভের পেছনে এরশাদ মামার চায়ের দোকান। এখানে ক্রমান্বয়ে শহরের উল্লেখ সংখ্যক সাহিত্য-সংস্কৃতিকর্মীগণ আড্ডা দিতে শুরু করলে এই জায়গাটি ‘পণ্ডিত-চত্ত্বর’ বলে পরিচিত হতে শুরু করে। এই আড্ডায় আলাপ-আলোচনা হয়েছে, তর্ক-বিতর্ক হয়েছে, মনোমালিন্য হয়েছে, ভালোবাসা হয়েছে, সাহিত্যপত্র প্রকাশিত হয়েছে, অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা হয়েছে; এমনকী আন্দোলনের পরিকল্পনা এবং বাস্তবায়নও হয়েছে। কুড়িগ্রামে আন্তঃনগর রেল চালুর জন্য প্রথম যে আন্দোলন কমিউনিস্ট পার্টি শুরু করেছিলো তার পরিকল্পনাও এখানেই করা হয়। যার প্রধান উদ্যোক্তা ছিলেন সাজেদুল ইসলাম সাজু। এই আড্ডা তুলনামূলক অনেকদিন স্থায়ী হয়েছিলো। কিন্তু জীবিকা প্রশ্নে অনেককে কুড়িগ্রাম ছাড়তে হলে এই আড্ডাও স্থবির হয়ে পড়ে। একসময় ফুটপাত ফাঁকা করার নামে এইসব চায়ের দোকান উচ্ছেদ করতে এই আড্ডাটি বিলুপ্ত হয়ে যায়।

 

সাম্য রাইয়ান’র আড্ডাগুলো
“আড্ডা” ছবি: ওয়াকিং ডিসট্যান্স

২০১০ -এ আমরা কয়েকজন পরিকল্পনা করে আড্ডার ব্যবস্থা করি। এই আড্ডার মেয়াদ ছিলো ১১ মাস। এই ১১ মাস প্রায় প্রতিদিন গর্ভমেন্ট হাই স্কুলের পুকুরপাড়ে আমাদের আড্ডা বসতো। এই আড্ডার রূপ ছিল খানিকটা ভিন্নতর। এখানে প্রতিদিন নির্দিষ্ট বইয়ের নির্বাচিত অংশ পাঠ করা হতো এবং চলতো আলোচনা। তারপরে স্বরচিত লেখা পাঠ ও আলোচনা। এবং সবশেষে লাল চা খাওয়া। এই আড্ডায় সাজেদুল আসলাম সাজু, মোকলেছুর রহমান, নেয়ামুল মিহাদ, নেয়ামুল ইসলাম, কবি শুভ্র সরখেলসহ প্রায় ২০-২৫ জন তরুণ নিয়মিত উপস্থিত থাকতো। এই আড্ডা থেকে ‘পদাতিক’ নামে ভাঁজপত্রের কয়েকটি সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছিলো।

এই সময়ের বছর খানেক আগে আরেকটি স্থানে আমাদের আড্ডা জমে ওঠে; ফায়ার সার্ভিসের উল্টোদিকে সোহাগের চায়ের দোকান। এটি ছিলো তরুণ-অতি তরুণ কবি-লেখক-বিপ্লবীদের আড্ডা দেয়া আর লুকিয়ে সিগারেট খাওয়ার এক অনন্য জায়গা। এখানে নিয়মিত উপস্থিত থাকতো শুভ্র সরখেল, গৌতম কুমার, নেয়ামুল ইসলাম, নেয়ামুল মিহাদ সহ আরও অনেক তরুণ, যাদের সবার নাম আজ আর মনে নেই। দীর্ঘদিন এখানে আড্ডা জমেছিলো। বর্তমানে এই দোকানটি নেই। দোকানের মালিক সোহাগ এখন বৈদ্যুতিক মিস্ত্রী। আমরা যখন বসতে শুরু করি তখন এইখানে প্রায় তেমন কেউ বসতো না; অধিক সময় ফাঁকাই থাকতো, আর মূল ভোক্তা ছিলো দোকানের সামনের বস্তির হরিজন সম্প্রদায়। কিন্তু আমরা বসতে শুরু করার পর এইখানে এত বেশি লোক সমাগম হলো যে, দোকানের জায়গা বৃদ্ধি করতে হলো, নতুন বেঞ্চ ও টেবিল যুক্ত করতে হলো। সোহাগের সাথে আমাদের তিনজনের (আমি, শুভ্র সরখেল, নেয়ামুল ইসলাম) এমনই সম্পর্ক ছিলো যে, আমরা ওঁর বিয়েতে বরযাত্রী হিসেবে গিয়েছিলাম। আমরা না যাওয়ার জন্য চেষ্টা করায় সোহাগের বাবা-মা দেড় ঘন্টা বিয়ের গাড়ি নিয়ে আমাদের জন্য অপেক্ষায় ছিলো। আর বলেছিলো, আমরা তিনজন না গেলে বরযাত্রী যাবে না। অবশেষে আমরা বরযাত্রী হিসেবে যাই এবং সারারাত একসাথে হৈ-হুল্লোর করে অনন্য সময় পার করি। এর মধ্যে আমি ঢাকা চলে যাই আর ফিরে এসে দেখি সোহাগের দোকান বন্ধ হয়ে গেছে!

কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারের বাম দিকে পাশাপাশি দু’টি চায়ের দোকান ছিলো। দু’টিই ভাঙাচোরা; আলাদা করে কোনও কর্মচারী ছিলো না; এখানে মালিকই একমাত্র কর্মচারী। এই দু’টি চায়ের দোকানকে কেন্দ্র করেও গড়ে ওঠে কবি-সাহিত্যিকদের আড্ডা। এর একটি ছিলো রুবেলের চায়ের দোকান, অপরটি শহিদুল ভাইয়ের চায়ের দোকান। এইসব দোকানে দিন কিংবা রাত, চলতো ঘন্টার পর ঘন্টা আড্ডা, কবিতাপাঠ। এখানে আমরা প্রায় প্রতিদিনই বসতাম; ছিলেন ছাত্র ইউনিয়নের নেতা মোকলেছুর রহমান, নিরঞ্জন চন্দ্র রায়, গল্পকার জুলকারনাইন স্বপন, কবি মাহফুজুর রহমান লিংকন, ছাত্র ফ্রন্ট নেতা গৌতম কুমার সহ অনেক তরুণ লেখক ও সংস্কৃতিকর্মী। রুবেলের মা বাড়িতে লাল চা বানিয়ে দিতেন আর রুবেল ফ্লাস্কে সেই চা নিয়ে এসে দোকানে বিক্রি করতো।

আরেকটি দোকানের মালিক শহিদুল ভাই হোটেল শ্রমিক ইউনিয়নের নেতা। আমাদের আড্ডা শুনে উনি বেশিক্ষণ দূরে থাকতে পারতেন না; দ্রুত হাতের কাজ সেরে এসে পাশে বসে কথা শুনতেন, কখনো বা অংশগ্রহণ করতেন। আর মাঝেমধ্যে অনেক জোর করলেও আমাদের চায়ের বিল নিতেন না। বলতেন, “এইটা আমি খাওয়াইলাম, আপনারাও তো মানুষের জন্য কতো কী করেন, তার তো বিল নেন না। আমি আর কী এমন খাওয়াইলাম; এক কাপ চা-ই তো।…”

এই দু’টি চায়ের দোকানের একটিও এখন আর নাই। জেলা পরিষদ সৌন্দর্য বর্ধনের নামে এই দুটিও উচ্ছেদ করেছে! রুবেল এখন অন্যের অটোরিকসা চালায়। আর শহিদুল ভাই অন্যের হোটেলে আবার কখনও বিয়ে বাড়িতে রাঁধুনীর কাজ করেন।

ঐ সময়েরই কথা, আরেকটা দারুণ আড্ডা জমে উঠেছিলো কেন্দ্রীয় কবরস্থানের সামনে কুলি শ্রমিকদের জন্য নির্মিত বাঁশের টঙে। এই আড্ডা বসতো সাধারণত রাত ৮টার দিকে। এই আড্ডার পথিকৃৎ বলা যায় জুলকারনাইন স্বপনকে। স্বপন ভাই আড্ডাপ্রিয় মানুষ। গল্প বলায় ওস্তাদ। প্রথমদিকে উনি একাই টঙে বসে থাকতেন। ক্রমান্বয়ে আমরা এক-দুই করে বসতে বসতে সেখানেও শুরু হলো তুমুল আড্ডা। সামনেই ছিলো একটিমাত্র খোলা চায়ের দোকান; দোকানের একমাত্র অবলম্বন ছিল একটি বাক্স, যার শরীরে বড় করে লেখা ছিলো ‘মোকছেদ টি স্টল’। এই দোকান থেকে আসতো লেবু চা। দীর্ঘ রাত পর্যন্ত চলা এই আড্ডায় নিয়মিত মুখ ছিলেন সাজেদুল ইসলাম সাজু, মাইকেল রবিন সরকার, রুকুনুজ্জামান রুকু (বাসদ নেতা), মোকসেমুল ফাহিম (বাসদ কর্মী), শুভ্র সরখেল। মাঝেমধ্যে আসতেন ইউসুফ আলমগীরসহ আরও কেউ কেউ। সাধারণত রাত্রি ১১টার মধ্যে অধিকাংশ আড্ডারুগণ চলে গেলে অবশিষ্ট থাকতেন জুলকারনাইন স্বপন, মাইকেল রবিন সরকার, মাহফুজুর রহমান লিংকন, সাজেদুল ইসলাম সাজু, শুভ্র সরখেল, কখনো বা মোকলেছুর রহমান; আমরা রাত্রি ১২ টা বা ১ টা পর্যন্ত আড্ডা দিয়ে তারপরে বাড়ি ফিরতাম।

একবার তো এমন হলো, আড্ডা দিয়ে সবাই চলে যাবার পর আমি, মাহফুজুর রহমান লিংকন আর জুলকারনাইন স্বপন, তিনজন ভাবছিলাম কিছুক্ষণ কথা বলে উঠি। এরপর আমরা বুঝতেই পারিনি সময় কীভাবে চলে গেছে! হঠাৎ শুনি মসজিদে আযান হচ্ছে। আমরা হতভম্ব! এ-ই-র-ক-ম জমজমাট আড্ডা হতো এইখানে। পৌরসভার উচ্ছেদের কবলে পড়ে এই আড্ডাও বন্ধ হয়ে যায়!

টঙটি তুলে দেয়ায় কবরস্থান আর ঘোষপাড়ার মধ্যবর্তী ওহাবের চায়ের দোকানে আমাদের আড্ডা শুরু হয়। আগের মতো জমজমাট না হলেও এখনও আমরা কেউ কেউ এখানেই আড্ডা দিই। আগের আড্ডারুগণ অধিকাংশই শহরে নাই; জেলার বাইরে থাকেন বিভিন্ন প্রয়োজনে। তাই শহরে সাহিত্য আড্ডা স্তিমিত। তবে ধর্মীয় ছুটিগুলোতে হঠাৎ করেই জমে ওঠে শাপলা চত্তর এলাকা, ওহাবের দোকান, আমাদের আড্ডাস্থল…।

পুরাতন শহরে পুরাতন পোস্ট অফিসের সামনে একটি অতি পুরোনো এবং পরিচিত চায়ের দোকানের নাম ‘তুলশী’। এখানে অধিকাংশ সময় অতি অগ্রজগণ আড্ডা দেয়ায় তরুণদের উপস্থিতি সীমিত। বলে রাখি, এই দোকানেই একদিন আড্ডা চলাকালে মাহফুজুর রহমান লিংকনের সাথে আমার পরিচয় ঘটে, মাইকেল রবিন সরকারের উপস্থিতিতে।

এখানে নিয়মিত আড্ডা দিতেন প্রয়াত অধ্যাপক তপন রুদ্র (সম্পাদক: অক্ষর; কাব্য, উপন্যাস, প্রবন্ধ গ্রন্থ রচয়িতা।)। অন্যান্যের মধ্যে এখানে দেখা মেলে কবি আশীষ বকসী, সংস্কৃতিকর্মী ও সাংবাদিক শ্যামল ভৌমিক, কবি হেলাল জাহাঙ্গীর, দেলোয়ার হোসেন মঞ্জু (নাট্যকর্মী), শাহানুর রহমান (সংস্কৃতিকর্মী), ইমতে আহসান শিলু (সংস্কৃতিকর্মী ও সাংবাদিক), জুলকারনাইন স্বপনসহ প্রমূখ ব্যক্তিবর্গের।

ভাষা আন্দোলন এবং পরবর্তীতে মুক্তিযুদ্ধ পার করে এই দোকান এখনও তার পুরোনো চেহারাতেই বহাল রয়েছে। দিনে দিনে আড্ডারুগণ পরিবর্তন হলেও এই দোকানের তেমন কিছুমাত্র পরিবর্তন ঘটেনি। যুগের পর যুগ বিভিন্ন প্রজন্মকে নির্দ্বিধায় ধারণ করে চলেছে এই তুলশী দোকান। শুনেছি একসময় কুড়িগ্রামের প্রথিতযশা কবি, লেখক, বিপ্লবী, সাংবাদিক, খেলোয়ারদের প্রধানতম আড্ডাস্থল ছিলো এটি।

আরেকটি হোটেলে আমাদের আড্ডা জমে উঠতো ‘চাইনিজের হোটেল’। শহিদ মিনারের ডান দিকে এই হোটেলটিতে আমরা প্রায়ই ঘন্টার পর ঘন্টা আড্ডা দিয়েছি। এই হোটেলের মালিক চাইনিজের ছিলো ভবঘুরে মন। টঙের আড্ডারুগণই এখানে উপস্থিত থাকতো। চাইনিজ ভাত বিক্রি করলেও কখনও ভাত খাওয়া হয়ে ওঠেনি এখানে। প্রায়ই চাইনিজ আমাকে আড়ালে ডেকে বলতো, “সাম্য দা, দ্যান তো একশটা টাকা; দোকান-টোকান ভাল লাগে না বাল, একটু ঘুরি আসি।”

চাইনিজ সেই হোটেল অন্য এক ব্যবসায়ীর কাছে হস্তান্তর (সম্ভবত বিক্রি) করেছে। এরপর এক মাসের মতো ফুটপাতে চায়ের দোকান দিয়েছিলো। বলতো, “বুঝলেন সাম্য দা, অত বড় হোটেলের মালিক ছিলাম, আমার কি এইসব চায়ের কেটলি ধোয়া মানায়, আপনিই কন?” ফুটপাতের দোকান বন্ধ করে ভাগ্য বদলাতে সেই চাইনিজ কিছুদিন ঢাকায় দিনমজুরিও করেছিলো! কিন্তু ভাগ্যের বদল ঘটেনি। কুড়িগ্রামের টানে আবার ফিরে এসেছে। শাপলার সেই ফুটপাতে এখন চাইনিজের নতুন চায়ের দোকান।

হোটেল আমন্ত্রন। মালিকের নাম মৃণাল ঘোষ হওয়ায় লোকে বলতো ‘ঘোষের হোটেল’। চাইনিজের দোকান বন্ধ হবার কিছু আগে থেকে এই হোটেলে প্রায় ২/৩ বছর জমিয়ে আড্ডা হয়েছে। প্রায় নিয়মিতই এখানে আসতেন জুলকারনাইন স্বপন, মৌসুমী রহমান বুবলী (নাট্যকর্মী), রুকুনুজ্জামান রুকু, মাইকেল রবিন সরকার। মাঝে মাঝে দেখা পাওয়া যেত মোকলেছুর রহমান, সেলিম সেতু (অ্যাডভোকেট), রাই বাবু, বাবলু, ইলিয়াডসহ প্রমূখ ব্যক্তিবর্গের। এই আড্ডায় শিল্প-সাহিত্য ও রাজনীতি ব্যতিত তেমন কোনও কথা হতো না। এখানে চা তেমন ভাল হতো না। আমরা প্রায় কেউই এখানকার চা পছন্দ করতাম না। কিন্তু হোটেলটি অনেক বড় জায়গাজুড়ে ফাঁকা পড়ে থাকায় আমাদের দীর্ঘসময় আড্ডা দেয়ার উপযুক্ত স্থান বলেই বিবেচিত ছিলো। পরবর্তীতে এখানে বসার মতো পরিবেশ নষ্ট হয়ে যাওয়ায় আমাদের দুই-একজন ব্যতিত আর সকলেই এখানে বসা বন্ধ করে দিয়েছিলো। এই হোটেলটিও এখন আর নেই। মৃণাল ঘোষ হোটেলটি বন্ধ করে দিয়েছেন।

এইসবের বাইরেও চলে আড্ডা। অনেকে নিজেদের মতো করে অনেক জায়গায়ই আড্ডা দেয়; কেউ এক বা দুইজন চায়ের দোকানে, প্রেসক্লাবে, বাবুল চশমা ঘরে, কোনও সংবাদকর্মীর কার্যালয়ে কিংবা অন্য কোথাও…। ২০১৭ -এ অবশ্য দেখা যাচ্ছে দুই-তিনটি ছোট গ্রুপ আয়োজন করে, ঘোষণা দিয়ে আড্ডা দিচ্ছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ফরমাল আড্ডাটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন ইউসুফ আলমগীর ও লাইলী বেগম; উভয়ই পোশায় সাংবাদিক। কুড়িগ্রাম প্রেসক্লাবে অনুষ্ঠিত এই আড্ডাটিতে শুনেছি কতক নবীনের যাতায়াত আছে। এই আড্ডা থেকে ট্যাবলয়েডের অর্ধেক আকৃতির একটি পত্রিকা প্রকাশিত হয়।

নিকট অতীতে এরকম ফরমাল আড্ডা সংঘটনের ইতিহাস আছে কুড়িগ্রামের বিলুপ্ত দু’টি স্থানীয় সাহিত্যিকদের সংগঠনের; ‘তরুণ লেখক ফোরাম’ এবং ‘চন্দ্রবিন্দু’। এঁদের আড্ডা ছিলো কলেজ মোড়স্থ সাধারণ পাঠাগার এবং রিভার ভিউ উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনে পাবলিক লাইব্রেরী।

মোরাল অব দ্য স্টোরি

আরবান কালচারের এক অশোভন রূপ, বাসিন্দারা নিজের শহরকে আর আপন ভাবতে পারে না। নিজের বাড়িতে থেকেও মানসিকভাবে নিজেকে ভাড়াটিয়া ভাবতে শুরু করে। ঢাকা সেই ভয়াবহতার নির্মম শিকার হয়েছে, বাংলাদেশের মনোরম মফস্বলগুলোও সেই পথে এগুচ্ছে! কুড়িগ্রাম শহরে এখন আড্ডা দেয়ার মতো, কলেজ মোড়ে, ফুটপাতে, শাপলা চত্ত্বরে চায়ের দোকান প্রায় নেই বললেই চলে। সৌন্দর্য বর্ধনের নামে আড্ডস্থল/চায়ের দোকান উচ্ছেদ করে পরিকল্পনাহীনভাবে ভবন-দালান তৈরির মাধ্যমে এই শহরকে প্রাণহীন এক যান্ত্রিক শহরে রূপান্তরিত করা হচ্ছে। যেভাবে ঢাকায় ছবির হাটের আড্ডা বন্ধ করা হয়েছে, টিএসসির আড্ডা সংকুচিত করা হয়েছে; একইভাবে, শুধু কুড়িগ্রাম নয়, সারা দেশে সাহিত্যিক-সংস্কৃতিকর্মীদের আড্ডাস্থলগুলো নানা অযুহাতে ধ্বংস করার প্রক্রিয়া অনেকদিন ধরেই চলছে।

সংগঠনের ফরমাল আড্ডা সাহিত্যের জন্য তেমন ফলপ্রসূ কিছু বয়ে আনতে পারেনি কখনও। বরং এসব থেকে জন্ম নিয়েছে হিংসা, কলহ, নোংরামি, দলাদলি, এমনকী হাতাহাতি-মারধরের ঘটনাও! সাহিত্যের জন্য সবসময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে চায়ের দোকান। সাহিত্য সংগঠনের নেতা নয়, আমাদের বরং কৃতজ্ঞ থাকা উচিত সেইসব চায়ের দোকানের প্রতি, যারা ব্যবসার ক্ষতি করেও ঘন্টার পর ঘন্টা আমাদের আড্ডার সুযোগ করে দিয়েছেন। আমি তাঁদের শ্রদ্ধা করি।

 

 

Advertisements

মন্তব্য করুন

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

Create your website at WordPress.com
Get started
%d bloggers like this:
search previous next tag category expand menu location phone mail time cart zoom edit close