ওয়াকিং ডিসট্যান্স ১ম সংখ্যা

সম্পাদকীয়

ছবি: ওয়াকিং ডিসট্যান্স

 

কবিতা

তাহিতি ফারজানা

শিমন রায়হান

গল্প

উপল বড়ুয়া

মোহাম্মদ জসিম

চিত্রকর্ম

নয়ন দে

মুক্তগদ্য

সাম্য রাইয়ান

নাভিল মানদার

তানজিন তামান্না

অনুবাদ

মাসুমুল আলম এর অনুবাদ : ওসামা আলোমার এর ছোটগল্প

আলোকচিত্র

সাম্য রাইয়ান

তানজিন তামান্না

ওয়াকিং ডিসট্যান্স ১ম সংখ্যা~সেপ্টেম্বর ২০১৮

cropped-walking-distance-logo.jpg

Advertisements

ওয়াকিং ডিসট্যান্স ২য় সংখ্যা

সম্পাদকীয়

Tanjin Tamanna r Photography

ছবি: তানজিন তামান্না

 

মুক্তগদ্য

সাম্য রাইয়ান

 

কার্টুন

মোজাই জীবন সফরী

 

কবিতা

অয়ন্ত ইমরুল

আহমেদ নকীব

কাজল সেন

শিমন রায়হান

সাম্য রাইয়ান

 

চিত্রকর্ম

আহমেদ নকীব

নয়ন দে

মনি মাঝি

সান্ত্বনা শাহ্‌রিন

সোহেল প্রাণন

 

গল্প

উপল বড়ুয়া

তানজিন তামান্না

মাসুমুল আলম

সুদেষ্ণা মজুমদার

 

অণুগল্প

মোহাম্মদ জসিম

 

আলোকচিত্র

আরেফিন অনু

কাজল সেন

সুমিতাভ অপু

 

ওয়াকিং ডিসট্যান্স ২য় সংখ্যা~অক্টোবর ২০১৮

cropped-walking-distance-logo.jpg

সম্পাদকীয়

লেখকদের সাড়া পেয়ে ভালো লাগছে। আসলে লেখকরা খুব ভালো। লেখকদের বন্ধুত্ব ভালো। লেখকদের দ্বন্দ্বও ভালো। নতুন নতুন লেখায় লেখকরা বেঁচে থাকুক। দেখতে দেখতে বারীন দা’র একটা বছর চলে গেলো। দেখতে দেখতে ২য় সংখ্যা…

 

সাম্য রাইয়ান

 

বাঘ

আমার মেয়েটি কিছুদিন থেকে বাঘের মাংস খেতে চায়৷ বাঘ বাঘ করে স্বপ্নে চিৎকার করে আমায় জড়িয়ে ধরে বলে, বাঘ— আমি বাঘের মাংস খাবো৷

বাঘ খুঁজতে বাজারে গিয়েছিলাম৷ পেলাম না৷ মেয়ে বললো, বাবা চলো জঙ্গলে যাই; জঙ্গলে অনেক বাঘ আছে৷

বউকে সাথে নিয়ে জঙ্গলে হাজির হলাম বাঘ খুঁজতে৷ অপেক্ষায় থেকে থেকে ক্লান্ত হয়ে হঠাৎ দূরে বাঘের গর্জন শুনতে পেলাম৷ সতর্ক আমি, ধীরে— ট্রিগার চেপে দিলাম গুলি বেরিয়ে লাগলো বাঘের পেটে৷ শব্দ হলো অনেক৷ কোত্থেকে যেন অতর্কিত চিৎকার এলো, ফায়ার—, একটা গুলি আমার কানের পাশ দিয়ে গেল৷ আমিও গুলি ছুঁড়লাম৷ গোলাগুলি হলো বেশ৷ দেখি— বউটা আমার পড়ে আছে, পাশে মেয়েটাও৷ চিৎকার করে ডাকলাম, বউ ওঠো—, ওঠো বাঘের বাচ্চা, কেউ উঠলো না৷ কারও ঘুম ভাঙলো না৷ শুধু পুলিশ এলো৷

আমাকে আদালতে তোলা হলো৷ বাঘ মেরেছি বলে ১২ বছরের কারাদণ্ড হলো আমার৷ শাস্তির ভারে নূয়ে পড়ে বললাম, আমার স্ত্রী–কন্যা — তাদের মৃত্যুর শাস্তি কেউ পাবে না? আদালত বললেন, অবশ্যই আমরা সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে৷

শিমন রায়হান

 

ময়ুরকুমারী

রুপকথার গল্পে- দূরতিক্রম্য নদী, চোরাবালি
দেওদানব আর আমাদের হাসফাস
এসব পেরিয়ে চুম্বন পোলভোল্ট খেলে
আলিঙ্গন পেরোয় পুলসিরাত
জাদুর ঘুমে রাজকন্যা আর সবচে উঁচু মিনার থেকে
নেমে আসে দুঃস্বপ্নের আশ্চর্য প্যারাস্যুট
ডালিমকুমারের হাতের তালু ঘেমে যায় উদ্বেগে
তবু রুপকথার নীল বইয়ে তার প্রতিশোধ
সংশয়ের রাতে ধনুক হারিয়ে পায়
পীতরঙা ঘোড়ার সুতীব্র জিন
মখমলের ফুল উড়ে যায় সূচিকর্মের বিকল্প নগরে


লেজ ও নাটাই বিষয়ক

লেজ দেখে কুকুরকে ঘুড়ি মনে হয়
ঘুড়িকে কুকুর
কেবল দৃশ্যান্তরের ফাঁকে
কোথাও নাটাই হাতে বসে থাকছেন প্রভু

কাজল সেন

 

অপেক্ষায় আছে এক রূপালী সকাল

অধিক মদ্যপানে সে অচঞ্চল স্থির। বরং কম মদ্যপানে তার শুরু হয় মাতলামি। তখন মদের নেশায় সে তার ছেলেকে মনে করে বাবা আর মেয়েকে মা। বৌকে মনে হয় শাশুড়ি আর শাশুড়িকে নেহাৎই বাল্যখিল্য চপলাকুমারী। যদিও চপলতা আদৌ ছিল না তার প্রতিদিনের যাপনে। চপলার সাথেও ছিল না কোনো তাপ বিনিময়ের খেলা। তবুও কেন যে সাগর উথলে ওঠে মধ্যদুপুরে! নদীতে ধেয়ে আসে ষাঁড়াষাড়ি বান! ভেসে যায় নির্দ্ধিধায় সেয়ানা চাতাল! ফুঁসে ওঠে দুরন্ত ফুটবল, ফুটবলের ছাল!  কতটা মদ্যপানে কতটা মাতাল, অঙ্ক কষে যদিও মাপা হয়নি তার পরিমান, তবে রাত্রি গভীর থেকে গভীরতর হলে নগ্ন হয় রাতের বাথান।

অপেক্ষায় আছি। অপেক্ষায় আছে এক রূপালী সকাল।

 

অপেক্ষায় আছে এক সোনালি দুপুর

এতক্ষণ কৃষিকাজের আলোচনার পর আমরা আলোচনা করতেই পারি শিল্প সম্পর্কে। শিল্প অর্থে ভারীশিল্প, মাঝারিশিল্প, হালকাশিল্প। আবার প্রাসঙ্গিক আলোচনায় আসতেই পারে হস্তশিল্প, পদশিল্প, চক্ষুশিল্প বা হৃদয়শিল্পের কথাও। যার শিল্প যত নিপুণ তার ততই মান। তাকে অনায়াসেই দেওয়া যেতে পারে দক্ষ শিল্পীর সম্মান। আর হাতে যদি কিছুটা সময় থাকে তাহলে আমরা অবশ্যই সেরে নিতে পারি কিছুটা সংস্কৃতির কথাও। মানে সংস্কৃতি, সুসংস্কৃতি, অপসংস্কৃতি। এছাড়াও আছে লৌকিক সংস্কৃতি, অলৌকিক সংস্কৃতি, পারলৌকিক সংস্কৃতি। এবং অতঃপর আমরা অনুপ্রবেশ করতেই পারি সঙ্গীতচর্চায়। আসলে আলোচনাটা নিরন্তর চালিয়ে যাওয়া দরকার। আর এভাবেই আলোচনা থেকে সমালোচনা, সমালোচনা থেকে পর্যালোচনা, পর্যালোচনা থেকে…

অপেক্ষায় আছি। অপেক্ষায় আছে এক সোনালি দুপুর।

আহমেদ নকীব

 

পোকা হয়ে যাবো

আমি যে মানুষ থেকে আজ পোকা হবো,
অথচ পোকারা সভা করে নিবে কিনা
এরকম স্যুটপরা লোকটাকে দলে

স্বামী তার রতিক্রিয়া ছেড়ে উড়ে যাবে 
পতংগের দলে, পাগল হয়েছে ভেবে
ডাক্তার ডাক্তার ডেকে একাকার সবে

কিভাবে লুকাবো মুখ আসবাব ঠেলে
চলেছি এবার তাই রক্তমাংস ফেলে

আমাকে পোকারা এখন হয়তো খাবে
শব ভেবে অন্ধকার ঝোপে, যার আজ
নেই কোনো চোখ আর মানুষের সাজ

 

গান গাবো বিজয়নগরে

ঝিঁঝিঁপোকা তোমাকে
কি যে রহস্যময় লাগে

ঝোপে বাজছে ঝুমঝুম

ছরতা দিয়ে ছ্যাতর ছ্যাত
শব্দ করলে তুমি ভাবো যে
তোমার জোড়া এসে দাঁড়ালো
লক্ষ্মীপুরের ছাদে

আর যদি প্রিয় সুপারি গাছ
থেকে নেমে কাছে আসো
আমিও একটা ঝিঁঝিঁ’র
মেয়ে হবো, আমার হাত
বাড়িয়ে দিবো তোমার
ঝিঁঝিঁ পাখার ঐকতানে

আমরা বাজাবো
শিখা’পার জার্মান রিডের
হারমোনিয়াম, যদিও
ছিঁড়া তানপুরা, একটা তারের,
সেও একসাথে সংগত
করতে এসে ঝিঁঝিঁ’র এক
প্রেমিক পুরুষ হবার লোভ
সামলাতে না পেরে আমাদের
গায়ে গা ঘেঁষে বসে পড়বে

ঝিঁঝিঁ তুমি কিন্তু লাজুক
হয়ে আবার উড়ে যেয়ো না

সবাই মিলে আমরা
ঝোপে ঝোপে তারস্বরে
গান গাবো বিজয়নগরে 

 

 

অয়ন্ত ইমরুল


দাদার হুঁকার মিড়ে

দূরে দূর লাগে খুব।ঘ্রাণে ঘ্রাণ লাগে।
চোখ পথ পায়।

দাদার হুঁকার মিড়ে,হাঁসকল দুলে
নানান মুদ্রায়--

শালিধান দেখো ডাকে।কত কি যে ভেবে
রাখে নলারোদ!

না করা নিমিষ ফুঁড়ে বেশ কথা ফুটে।
কোথাও নীরোদ--

গানের গালে মাখিয়ে দেয় ঘিমঙ্গল
এইভাবে বুঝি--

বিঁধে ভাতধ্বনি!বাড়ি বের করা সন্ধে
ঝিঁঝিঁ জুড়ে রাজি।

ক্রমে ওঠে,পুঁথিঘরে-পিঁড়ির হুল্লোড়;
সুয়োপাখি ধরা,

পিপুলের বন কাঁপে,কাঁপে ভানা বউ-
পুরির ফুল্লরা।

তুমিও তো কাঁপো বালা--হিম আর হেমে
কামিজের বুলি।

আমারে জাগিয়ে রেখে অলীক দুনিয়া
খায় চন্দ্রপুলি।


ছুটি বারে

ভাবনা ফুঁড়া ডল
উজালা থিমপার্ক
ছুটি করা বৃষ্টির ঝুমঝুমি 

যে ভাবেই নাচাও তিতলির রঙ
অনুরাগে ভেজা তোমার দোহারা
ভেজা অই রশ্মি বোনা হাতের রেখা

তিরির ঢেউয়ে যাওয়া 
পেন্ডুলামের দোল এখন বরফ ও বরফি

দৃশ্যে কিছুটা কাঁপন রেখে
দাঁড় বাওয়া 
দাঁড়ের পাখিকে শেখানো উড়াল
বুলানো হল
চলছে দীন আর ক্লান্তির লে অফ 

সখি টেলিস্কোপে যাও
সখি শরসূনায় যাও

আমার সলতে নিভে যায় 
হাওয়ার কাপলিংয়ে
আমার কাহারবা উলটে যায় বাতা সেলে

খুব করে 
গান গায় ছায়ার স্ত্রী লিঙ্গ

সুদেষ্ণা মজুমদার

 

হে ঈশ্বরী!

বিকালের আলো বড়োই ম্লান। আলোর মনে সুখ নাই। বিষণ্ণ হইয়াই আজ গোটা দিন কাটাইয়াছে। এখন যাইতেই হইবে। সূর্যের তেজ লজ্জাকর রকম কম ছিল। কিছুটা মেঘলা, কিছুটা ভেজা বাতাস কোথা হইতে আসিয়াছিল, অজানা। বৃষ্টি কিন্তু হয় নাই। বৃষ্টি হইলে খারাপ হইত না। আশ্বিনের আকাশে এখনো দুই-চারিটি ঘুড়ি না চাহিয়াও উড়িতেছে। কোথাও যেন বিশ্রামের অবকাশের অভাব। সূর্যও এই আকাশ ছাড়িয়া পাটে গিয়াছে মিনিট দুই হইল। টুপ করিয়া ঝরিয়া পড়িবার আগে গাছের মাথায় তাহার শেষ পরশটুকু দিয়া গিয়াছিল। সারাদিনে এইটুকুই রশ্মিপাত। অদ্যপি তাহাও হারাইয়া গিয়াছে। আগের মতো গাছই বা আর কোথায়! গাছের বদলে বহুতল গৃহের সারি। বড়ো বেখাপ্পা লাগে। কিন্তু করার কিছু নাই। না মনলতার না বিকালের।

বর্তমানে মনলতার বয়স খান পঞ্চাশেকও হয় নাই। চুলে পাক ধরিয়াছে। তা আজ নহে, কুড়ি বৎসর আগেই শুরু হইয়াছে। তখন তাহার যৌবন যতখানি তীব্র ছিল, আজ তাহা স্তিমিত হইয়াও যেটুকু বাঁচিয়া আছে, অনেক কিছু করিবার ক্ষমতা মনলতা রাখে। মনলতা ভাবিল, আজ রবিবার, আর একটু পরেই শেষ হইয়া যাইবে ছুটির দিনটি। আবার আগামী কল্য হইতে অফিস যাইতে হইবে। নামকরা প্রকাশনী সংস্থায় মনলতা ভালো বেতনে খাটিতে যায়। তাক হইতে নেশার দ্রব্যটি হাতে লইয়া বারান্দা হইতে কাপড় তুলিতে গেল সে। একটু আগে চা খাইয়াছে। দুধ-চিনি দিয়া কড়া করিয়া এক কাপ চা। মুখে চায়ের স্বাদ যাহা পড়িয়া আছে, বারবার মনে করাইতেছে, একটু নেশা করা যাক। নাহ্‌! কাপড়গুলি উঠাইয়া ঘরে রাখিয়া তাহার পর নেশা। তিষ্ঠ তিষ্ঠ।

না, মনলতার এখনো এতখানি বয়স হয় নাই যে সব বিস্মৃত হইবে। সে এ-গৃহে আসিয়াছে তা-ও প্রায় বছর দশেক হইল। দশ বৎসর পূর্বে এই এলাকায় যত গাছ ছিল, বারোতলার উপর হইতে দেখিলে মনে হইত জঙ্গল। মনলতা ভাবিতেছে। কাপড় তুলিয়া বারান্দার বামপার্শ্বের দরজার চৌকাঠে বসিয়া আকাশের দিকে তাকাইল মনলতা। হ্যাঁ, তাহার এই আধুনিক বাসস্থানটিতে এই বারান্দার দরজাতেই উচ্চতায় সামান্য বেশি একটি চৌকাঠ আছে। এখানে বসিয়া আকাশ-বাতাস দেখিবার নিমিত্তেই মনলতার ইচ্ছানুসারে প্রোমোটার ব্যক্তিটি এইরূপ দরজা বানাইতে বাধ্য হইয়াছিল। ঘরের অন্যান্য দরজার সহিত যা মানানসই নহে। মনলতার তাহাতে কিছু যায় আসে না। সে প্রয়োজন বোঝে, সাজসজ্জা বুঝিতে তাহার বইয়া গেছে। বাড়াবাড়ি লাগে। একার জীবনে আরামটুকুর সঙ্গে স্বস্তিই সে চাহিয়া আসিয়াছে। বিশ্রামের সময় হাত-পা ছড়াইয়া উপাধানে আয়েশ করিয়া শুইবার সময়ও সে আরামটুকুর কথা মাথায় রাখে। কেহ দেখিতে পারে, সে সুযোগ এই ঘরে নাই। একার আবার লজ্জা কীসের! মনলতা খোলামেলা থাকিতে পছন্দ করে। তাহার চোখে এইক্ষণে চশমা নাই। তাহাতে কোনো গোল বাঁধিবার অবকাশও নাই। কারণ, আকাশ দেখিতে চশমা লাগে না। খালি চোখে তাহার গতিবিধি নজরে আসে। আকাশে বিকাল পাড়ি দিতাছে সঙ্গে দুই-চারিটি ঘুড়ি। অবশ্য ঘুড়িগুলি এক-এক করিয়া মালিকের হস্তগত হইবার আশঙ্কায় ধীরে ধীরে অনিচ্ছাসত্ত্বেও নামিয়া আসিতেছে। অন্ধকারে তাহাদের উড়িতে কোনো ভয় নাই। ভয় তো মালিকদের। তাহারা উড়াইতে পারিবে না। দেখিতে পারিবে না ঘুড়ির গতিবিধি। দেখিতে পারিবে না ঘুড়ি কোন পথ ধরিয়া ঘুরিয়া বেড়াইতেছে। ঘুড়ি উড়িবে ঠিকই, কিন্তু মালিক তো ঠিক করিবে তাহার পথ। মনলতা ভাবিতেছিল, তাহার উড়াউড়ির বিষয়ে। যৌবনের সাধ তাহার এখনো আছে। যত্রতত্র উড়িবার। সাধ্য কমিয়া গিয়াছে।

হ্যাঁ, অনেক উড়িয়াছে মনলতা। তাহার দেহ সৌষ্ঠব যাহাই হউক না কেন। বাঙালি নারীর তুলনায় সে কিঞ্চিৎ লম্বা, গাত্রবর্ণ উজ্জ্বল শ্যাম, গায়ে মাংস আছে, চর্বি নাই। কেউ কেউ বলে, মনলতা কিছুটা যেন পুরুষালি ভাবের। নারীর মমতা তাহার দেহে নাই। হয়তো বা! মনলতার মাথার চুল ক্ষণস্থায়ী হইবার প্রয়াসে। দাঁতের গঠন মন্দ নহে। বাহির হইতে যতটুকু দেখা যায়। সে না হাসিলে বোঝা যায় না তাহার হাসিটি মনকাড়া। এক কথায় মনলতাকে সুন্দরী বলা চলে না। কিন্তু তাহার মন সৌষ্ঠব অপরিমিত। সেখানে কোনো আগল নাই। মনের গতির স্বভাব বলা চলে ঢিলেঢালা। ফলে, সে ধরা-বাঁধা জীবনে হাঁপাইয়া উঠে। মনে পড়িল বিল্বপত্রের কথা। নাম বিল্বপত্র, কিন্তু বড্ড একমুখী পুরুষ ছিল। অন্তত মনলতার পূজায় লাগে না। দেখিতে মন্দ ছিল না। সুগঠিত বাহুদ্বয়ের কথা মনলতার মনে পড়ে। এবং তাহার আঙুলের সুষমা। নিপুণ করিয়া কাটা নখ। পুরুষটি যত্ন লইত বটে! অবিশ্যি যতটা শরীরের, ততটা মনের নহে। মনলতার বিপরীতই বলা চলে। স্ত্রী-জাতির স্বচ্ছন্দ চলন-বলনে তাহার কেমন যেন আড়ষ্টতা ছিল। তবু মনলতা মন বাদ দিয়া বিল্বপত্রের শরীরের দিকে চাহিয়া থাকিত। যাহাতে যতটুকু সুখ। পেশীর বলিষ্ঠ চলনের পাশাপাশি দেহের কিঞ্চিৎ মেদ বিল্বপত্রকে লাবণ্যময় করিয়াছিল। মুখের গঠনেও কেমন একটি নম্র ভাব ছিল। এক ধরনের মেয়েলি নম্রতা। মনলতাকে মুগ্ধ করিত।

সন্ধ্যা ঘনাইয়া আসিতেছে। আর উন্মনা হইলে চলিবে না মনলতার। সন্ধ্যা আহ্নিকে বসিতে হইবে। এই একটা দিনই সে একটু ভালো করিয়া, মনের মতো করিয়া আহ্নিক করে। সকালে একদফা, সূর্য অস্ত যাইলে দ্বিতীয় দফা। মনলতা বারান্দা হইতে উঠিয়া ঘরে যাইল। গা ধুইতে উৎসাহী হইল। পরনের পোশাকগুলি সম্পূর্ণ ছাড়িয়া সুন্দর করিয়া গাত্র মার্জন করিয়া, পুনঃপুনঃ জল ঢালিয়া গা ধুইয়া পূজার শাড়িটি পরিধান করিল। খেয়াল করিলে দেখা যাইবে শাড়ি ছাড়িবার সময় তাহার কোমরের ভাঁজ হইতে নেশার দ্রব্যটি টুপ করিয়া মেঝেয় খসিয়া পড়ি্যাছে। মনলতা খেয়াল করিল না। ভুলিয়া গিয়াছে সেটির কথা। তাহার অঙ্গে এক্ষণে একটি গরদের শাড়ি, যাহার পাড়টি কালো। ভিতরে আর কোনো বস্ত্র নাই। পূজায় বসিলে সেলাই করা বস্ত্র পরিধান নিষিদ্ধ।

মনলতার পূজা-পদ্ধতি সম্পূর্ণ তাহার নিজস্ব। শৈশবে, কৈশোরে মা-দিদিমার পূজা সে যাহা দেখিয়াছে, তাহাতে তাহার কোনো কালেই আস্থা ছিল না। সে সর্বদাই নিজ-পন্থা অবলম্বনে আনন্দ পাইয়া থাকে। পূজাস্থানে প্রদীপ জ্বালাইয়া ধ্যানে বসিল। কপালের মধ্যখানে মনোনিবেশ করিতে চেষ্টা করিল। ঘরে আর কোনো বাতি জ্বলিতেছে না। মনোনিবেশের কেন্দ্রটিতে ঝিলিমিলি অন্ধকার দৃষ্ট হইল। দু-তিন পল পরেই সেই অন্ধকারে বিল্বপত্রের মুখচ্ছবি ফুটিয়া উঠিতেই মনলতা বিরক্ত হইল। এত বছর পরে কেন এইসব বিহ্বলতা, যাহা মনের নিবিষ্টতায় বিঘ্ন ঘটাইতেছে! বিকালেই যাহা শেষ হইয়া যাওয়া উচিত ছিল। অন্য কেহ নহে, কেবল বিল্বপত্র কেন? আরো কত মানুষই তো আসিয়াছিল মনলতার জীবনে। পূজার সময় এহেন আকস্মিক ঝঞ্ঝাবাত হইতে রক্ষা পাইতে বিক্ষিপ্ত মনলতা চক্ষু মেলিল। মন মাপিবার যন্ত্রের অভাব পুনরায় অনুভব করিল মনলতা। তাহার ইষ্ট দেবীর মুখে কোথাও যেন অল্প কারুণ্য। খুব ভালো করিয়া খেয়াল করিবার জন্য মনলতা প্রদীপখানি তুলিয়া ইষ্ট দেবীর মুখের সামনে ধরিল। না, এখন আর কারুণ্য নাই, সে-স্থলে দিব্য হাসি দেখিতে পাইতেছে। মনলতা আনন্দ পাইল। সে আবার চোখ বুজিয়া ধ্যানে নিমগ্ন হইল। শান্তি। আর বিল্বপত্রের ছবি নাই। এক অপার আঁধার, অপার সুষমামণ্ডিত মৃদু হাস্যযুক্ত সুগন্ধি শান্তি বিরাজ করিতেছে। এইরূপে বেশ কয়েক মিনিট কাটিয়া গেল। মনলতা বিভোর হইয়া ধূপের সৌরভে মিশিয়া গেল। পূজা শেষে মনলতা শঙ্খে ফুঁ দিলো। ততক্ষণ, যতক্ষণ পর্যন্ত তাহার নিঃশ্বাস রহিল। উৎফুল্ল হইল তাহার মন। মৃদু হাস্যে অবিচল মনলতা আদর করিল তাহার দেবীকে।

রাত্রি খুব ধীর গতিতে আসিতে চাহিতেছে।

 

দুই

আজ সোমবার। আজ অফিস। আলস্য করিবার উপায় নাহি আর। আগামী ছয়টি দিন অপরের জীবনের উন্নতি হেতু মনলতা ঘূর্ণ্যমান হইয়া কাটাইবে। বিতৃষ্ণা আসিতেছে। চাকুরিটি ছাড়িয়া দিবার কথা প্রায়ই ভাবে সে। পারে নাই। মাসান্তে কয়েক মুঠি নগদ টাকা তাহাকে আবিষ্ট করিয়া রাখে। টাকার পরিবর্তে কত কিছু পাওয়া যায়! কতটা প্রয়োজন মনলতার? নিজের বলিতে আর কেহ তো নাই তাহার জীবনে। সবাই মনলতাকে ছাড়িয়াছে না মনলতা সবাইকে ছাড়িয়াছে, আজ তাহা অপ্রয়োজনীয়। এ-বয়সে এইরূপ বাতুলতা আর সুখানুভূতি দেয় না। তড়িদ্‌গতিতে প্রস্তুত হইতে লাগিল মনলতা। মনে করিবার চেষ্টা করিল শনিবারের কথা। অফিসে কোন কর্মটি সে অসমাপ্ত ছাড়িয়া আসিয়াছিল। মনে পড়িল না। কিছুতেই না। ফলে, একটি খিঁচ মনলতার মনে মাথা চাড়া দিয়া উঠিল। মনে করিতে পারিল না, কোনো কাজ সে বাড়িতে লইয়া আসিয়াছিল কিনা। কাজের টেবিলে ভালো করিয়া চোখ বুলাইয়া দেখিল কোনো দরকারি কাগজপত্র পড়িয়া আছে কিনা। একবার নিজের কাঁধের ব্যাগটিও পরীক্ষা করিল। নাই। তবুও খিঁচটি দূর হইল না। একটা গণ্ডগোল তো কোথাও অবশ্যই হইতেছে!

শাড়ি পরিয়া প্রাতঃরাশ করিবার জন্য খাবার টেবিলে বসিল মনলতা। ঘড়ির দিকে চোখ গেল তাহার। আটটা বাজিতে দশ। জন্মেজয় নির্ঘাত আসিয়া গাড়ি লাগাইয়া দিয়াছে। জন্মেজয় তাহার ড্রাইভার। আজ অবধি একটি বারের জন্যও এই ছেলেটি সময় ভুল করে নাই। রাগ হয় মনলতার। ভুল করিতে পারিত। কে বারণ করিয়াছে? আলস্য। আলস্য। মনলতাকে সপ্তাহের প্রথমদিন আলস্য ঘিরিয়া ধরিয়াছে। এটা ইদানীং প্রায়শই ঘটিতেছে। একটি লম্বা ছুটি কি মনলতার এই আলস্য দূর করিতে পারিবে? ফালতু চিন্তা, চিঁড়ার মধ্যে দধি ঢালিতে ঢালিতে ভাবিল সে। চিনি লইবে না। উঠিয়া ফ্রিজ হইতে একটি নরম পাকের সন্দেশ লইয়া আসিল। ইহাতে মিষ্টি যতটুকু আছে, কম নহে। তাড়াতাড়ি খাওয়া শেষ করিয়া হাত ধুইয়া ইষ্ট দেবীর নিকট গিয়া কয়েক মুহূর্ত দাঁড়াইয়া রহিল মনলতা। বিদায় লইল তাহার প্রিয়তমার কাছ হইতে। এই ছোট্ট একটি মূর্তি কি শুধুই মূর্তি? দেবীকে হাতে তুলিয়া বুকের কাছে ধরিল। চুম্বন দিলো দেবীর কপোলে। রাখিয়া দিলো দেবীকে। গুছাইয়া লইল যাহা কিছু বহনের। মনটাকে পায়ের জূতাতে আবদ্ধ করিল। প্রস্তুতি সম্পূর্ণ। দরজায় তালা লাগাইয়া সিঁড়ির দিকে পা বাড়াইল মনলতা।

গাড়িতে উঠিবার পূর্বে মনলতা একবার নিজ-গৃহ পানে চাহিল। বারান্দায় কেহ অপেক্ষায় নাই জানিয়াও সে মুখ তুলিয়া বারোতলার দিকে দৃষ্টিপাত করিল। কূটাভ্যাস! ভাবিল, দরজা বন্ধ করিয়াছে তো? তালা? তালা কি সবকিছু রক্ষা করিতে পারে? সংশয় মনলতার আবাল্য। দ্বিধা। বিশ্বাস। নির্ভরশীলতার কাঙ্ক্ষা। সব মিলিয়া এক চতুষ্পার্শ্বিক টানাপোড়েন। মনলতার জীবন ছাইয়া রহিয়াছে এইরূপ নানাবিধ সমাধান-অযোগ্য টানাপোড়েনে। যদিও, সম্ভবত মনলতা সমাধানে বিন্দুমাত্র প্রয়াসী নহে। জীবন যেভাবে তাহাকে যাহা দিতাছে, দিয়া আসিয়াছে, সহজভাবে তাহা গ্রহণ করিতে মনলতা কার্পণ্য করে না। শাড়ির পাড়ের নকশা লইয়া তাহার কোনোদিন মাথাব্যথা নাই। যে কোনো জিনিসই খুব কটকটে না হইলেই হইল। তাহার চোখে, অবশ্যই। এ লইয়া মনলতা কদাপি ঝুট-ঝামেলায় যায় না। তাহার স্বভাবে একটি আপাত নির্লিপ্ততা আছে। মুচকি মুচকি হাসি আছে। তবে সর্বদা সে এইরূপ নির্লিপ্ত নহে। দায়িত্ব পালনে সে কঠোর। কিন্তু, তাহার কাছে বেশ কিছু বিষয় তুচ্ছ, যাহা অপরাপর মানুষের কাছে প্রবল গুরুত্বপূর্ণ। মনলতার হাসিটি বড়ো মনোরম। সেটি তাহার কখনো কখনো রক্ষাকবচও বটে।

সকালের একটু একটু কুয়াশা-কুয়াশা ভাব। যদিও ঋতু অন্য। শীত আসিতে এখনো বেশ দেরি। শীত আসিলে জন্ম আসিবে। শীত আসিলে দুঃখ আসিবে। শীত আসিলে কিছু চাদর এলোমেলো উড়িবে। মনলতা শীতের সন্তান। কিছুদিন আগে পর্যন্ত তাহার শীত ঋতু অপছন্দের ছিল। ইদানীং শীতের প্রতি একটি টান আসিতেছে। তাহা উত্তাপ হেতু কিছুটা তো বটেই, আমেজের বিষয়টিও একপ্রকার উল্লেখনীয়। একটু গুটাইতে ইচ্ছা করে। ধনেপাতা গাছের ঝিরঝিরে অবয়বে হাত বুলাইতে ইচ্ছা করে। আঁধার-ভোরে ঝোপ হইতে ছিঁড়িয়া আনা কচি-কচি সবুজ মৌরি মুখে দিয়া কলিকাতার বাস ধরিতে ইচ্ছা করে। শৈশবে ফেরা যায় না। তাহা ছেঁড়া-ছেঁড়া। দু-একটি ঝলক মাত্র।

ঘুমাইয়া পড়িয়াছিল মনলতা। রাত্রে তাহার ঘুম যে ভালো হয় নাই তাহা নহে। তবু কেন যে সে ঘুমাইয়া পড়িল, রহস্য। গাড়ির চালকের ‘ম্যাডাম’ ডাকে ঘুম ভাঙিয়া মনলতা প্রথমে বুঝিতেই পারিল না কোথায় আসিয়াছে। আয়নার মধ্য দিয়া চালকের পানে দু-এক পল তাকাইয়া থাকিল মনলতা। চালক কোনোরূপ ধৃষ্টতা দেখাইল না। সে চুপ করিয়া অন্য দিকে তাকাইয়া রহিল। মনলতা ভাবিল, আমি কি বৃদ্ধ হইয়া গেলাম? বয়স তো পঞ্চাশও ছোঁয় নাই! এমন তো আগে কখনো হয় নাই! এই জায়গাটায়ই তাহার অফিস, মনলতা এক্ষণে বুঝিল। হাত দিয়া মুখ মুছিয়া চালককে কিছু না বলিয়াই মনলতা গাড়ি হইতে নামিয়া গেল। চলন একটু যেন শ্লথ। পায়ে জোর একটু কম বোধ করিতেছিল সে। ঘাড়ে একটু ব্যথা অনুভবে সে বুঝিল ঘুমাইবার সময় তাহার মাথা ঝুঁকিয়া পড়িয়াছিল নিশ্চয়। নাকি, রাত্রে শুইবার দোষে? ঘাড়ে হাত বুলাইতে বুলাইতে মনলতা অফিস-বাড়ির দরজা ঠেলিয়া ভিতরে প্রবেশ করিল। দারোয়ান তাহাকে পরিচিত সেলাম ঠুকিল। সেদিকে মন দিবার অবকাশ নাই মনলতার। হাসিখুশি, দরদি মনলতা সচরাচর এমনটা করে না। দারোয়ান একটু অবাক হইল। দীর্ঘ দিন এই সংস্থায় সে কাজ করিতেছে। বেশি কিছু সে চাহে না, সামান্য তাহার চাহিদা। ওপরওয়ালাদের এক টুকরা হাসি।

কর্মঠ মনলতা ভাবিল, তাহার দিন কি শেষ হইয়া আসিতেছে? একার জীবনে এইরূপ নানাবিধ চিত্তচাঞ্চল্য ঘটিতে পারে বলিয়াই মনে হয়। মনলতা অফিস করে, বাজারহাট করে, ক্ষুৎপিপাসা নিবারণ করে, আজকাল বন্ধু-বান্ধব বিশেষ না থাকায় বাহিরের জগতে তাহার খুব একটা যাতায়াত নাই। যৌনতা নিবারণের ইচ্ছা আর তেমনটা হয় না। বলা যাইতে পারে, এক ধরনের স্থিতাবস্থায় দিন কাটায় মনলতা। এবং হয়তো বা এই কারণে, সে ইদানীং ঈশ্বরীমুখীন। হ্যাঁ, তাহার মানসভ্রমণ ঈশ্বর নহে, ঈশ্বরীর প্রতিই অনুগত। এই বিশাল সৃষ্টি, নারী ছাড়া আর কে করিবে? প্রাণের সৃষ্টি করিবার ক্ষমতা কোনো পুরুষের থাকিতে পারে না। মনলতার চারিপার্শ্বে প্রাণের প্রাচুর্য তাহাকে বিচলিত করে। সে ভাবে, আহা, এত প্রাণ, সেখানে তাহার মতো এমত অণুসম একটি প্রাণ কেমনে বাঁচিয়া আছে।

মৃত্যুচিন্তা? এত শীঘ্র! হঠাৎ তাহার বারান্দায় রাখা গাছগুলির কথা মনে হইল। সকালে কি জল দিয়াছিল সে? নাকি ভুলিয়া গিয়াছে। এ এক নূতন অসুখ হইয়াছে মনলতার। ভুলিয়া যাওয়া। মৃত্যু কি আসন্ন? ভুলিয়া যাওয়া, স্মৃতিকাতরতা, যখন-তখন ঘুমাইয়া পড়া নানাবিধ মনোবিকলনের লক্ষণ বলিয়া ধার্য করিতে চাহিলেও উপেক্ষা করিতে পারিল না মনলতা। কিন্তু সব কর্মের অবসান তো এখনো হয় নাই। সত্যই কি কোনো কর্ম এখনো বাকি রহিয়াছে? কী কর্ম করিবার জন্য মনলতা জন্মিয়াছিল? স্বামী-কন্যা-পুত্র-সংসার—এই সমস্ত প্রতিপালনের নাম কি কর্ম সম্পাদন? সে পথে যদি কেহ না যায়, তাহা হইলে তাহার কী কোনো কর্ম নাই? নাকি এই যে মনলতা নিয়মিত অফিসে আসে, দায়িত্ব পালন করিয়া কয়েক মুঠি টাকা উপার্জন করে, রান্না করিয়া খায়, পূজা করে, বাজারহাট করে, বা আরো যা-যা সব, সেগুলিকে কি কর্ম বলা চলে? নাকি অপরের জন্য কিছু করার নাম কর্ম? এবম্বিধ ক্ষুদ্র-ক্ষুদ্র চিন্তা লাগাতার মনলতার মস্তিষ্কে ঘুণপোকার ন্যায় কুটকুট করিতে লাগিল। মনলতা সব ঘুণপোকা ঝাড়িয়া ফেলিয়া তাহার নিজস্ব চেয়ারে উপবেশন করিল। তৎক্ষণাৎ তাহার মনে পড়িল অফিসের যাবতীয় কাগজপত্র ইত্যাদি যে চেস্টে থাকে, তাহার চাবিটি শনিবার বাড়ি ফিরিয়া ব্যাগ হইতে অকারণে বাহির করিয়াছিল! নির্ঘাত বাড়িতেই ফেলিয়া আসিয়াছে। এতক্ষণে খিঁচটি পরিষ্কার হইল। হাসিল মনলতা। তাহার সেই মনোরম হাসিটি।

গল্পের বাকী অংশ আগামী সংখ্যায় প্রকাশিতব্য

  

 

 

সাম্য রাইয়ান

সময়ের অসহায় দাস

এখন মাতাল হবার সময়!
সময়ের
অসহায় দাস হওয়ার চেয়ে মাতাল হও,
একটুও না থেমে অবিরল!
মদ, কবিতা অথবা উৎকর্ষ
যেটা তোমার পছন্দের
-বোদলেয়ার

সময়ের অসহায় দাস হওয়ার চেয়ে মাতাল হওয়াকেই অনেক বেশি শ্রেয় মনে করে করেছেন কবি বোদলেয়ার। কেননা তিনি জানতেন, কেবলমাত্র মাতালই বলতে পারে- এখন ভাঙচুরের সময়! কিন্তু সময়ের অসহায় দাস, সে কেবল বিকলাঙ্গচিন্তিত জীবন যাপন করে। কিন্তু ল্যনীয় বিষয়, পতিতারাই প্রসিদ্ধ এখন।

প্রতিটি মানুষ জন্মগতভাবেই রাজনৈতিক জীব; এটা নতুন করে প্রমাণের কিছু নেই। কিন্তু আজও অনেক প্রতিক্রিয়াশীল ব্যক্তি বা সংগঠন নিজেকে ‘অরাজনৈতিক’ বলে প্রচার-প্রপাগান্ডা চালিয়ে নিজের চর্চিত হাজার বছরের পুরনো-বস্তাপঁচা মাল জনগনের সামনে হাজির করছে গর্বের সাথে, সুচতুরভাবে; নিজের অসৎ উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য। নতুন পদ্ধতিতে-নতুন-মোড়কে। কিন্তু বোল আলাদা হলেও মাল এক-; হাজার বছরের বস্তাপঁচা।

অথচ এদেরই দম্ভোক্তি সর্বোত্র, দাপুটে বিচরণ প্রসারিত হচ্ছে ক্রমাগত। মনে রাখতে হবে, এই দাপুটে অবস্থা কিন্তু তাদের- যারা এইসব প্রতিষ্ঠানের মালিক/পরিচালক। আর স্বোচ্ছাসেবি(!)/কর্মীরা সময়ের অসহায় দাসমাত্র। এই দাসেদের না আছে জ্ঞানগরিমা, না আছে আত্মমর্যাদা। মালিকেরা যেভাবে পরিচালনা করে, সামান্য কিছু লাভের আশায়- লোভে পড়ে- এরা সেই পথেই চলে; ভালো-মন্দ বিচারের যোগ্যতা এদের নেই, তা নষ্ট করে দেয়া হয়েছে অনেক আগেই। এরা জানেই না- এরা দাস! আর তাই এদের মধ্যে মুক্তির আকাঙ্খার প্রশ্নই ওঠে না।

 

মাসুমুল আলম

 

সমবেত হত্যাকাণ্ড

আমরা তাকে বলতাম যে সে খুব বড়ো হবে। সে বলত, জানিস, আমাদের পরিবারের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা আছে। এতে আমাদের সকলের ভেতরে বিদ্যুৎ খেলে যায়, বলি: আমাদের তুমি খাওয়াও দোস্‌ত। তুমি একটা বড়ো কাজ করছ! সে তার এই কাজটির ব্যাপারে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায় না, কিন্তু আমাদেরকে সে খাওয়ায়, আমরা ঢেঁকুর তুলি তৃপ্তির। আমরা বলি: দোস্‌ত তুমি খুব নাম পাবা! ঐ ব্যাপারে সে পূর্বরূপ প্রতিক্রিয়াশূন্য। আর আমাদের জ্বলে যায়, বড্ড জ্বলে যায়… শালা! আমরা শলা করি আর ফলস্বরূপ দেখা যায় সে ক্রমে আসক্ত হয়ে পড়ছে…। এদিকে আমরা বাড়ি বানাই কিংবা তদ্রুপ উন্নতিতে তৎপর, গাড়িও বানাই (সংগ্রহ করি) আর সুন্দরী স্ত্রীও সংযোগ করি এক সময়…।

এখন দেখিবামাত্র আমরা তাকে এড়িয়ে যাই। তার সাথে আমরা সম্পর্কও নষ্ট করি যখন সে তার সমস্ত সম্পত্তি বিক্রি-বাটা করে আমাদের পেছনে খুইয়েছে দেদার আর তার নেশার পেছনেও উড়িয়েছে ধুমধাম। সে প্রায়শই বলত যে তাদের বংশে আত্মহত্যার প্রবণতা আছে আর জানতাম যে তার পিতামহ, পিতা এবং ফুফুও… সব্বাই একে-একে আত্মহত্যা করেছে। আমরা সব শখের ব্যক্তি, এবং আমরা সুখের পায়রা, শুনি: ও-ও মরলো…! আমরা আমাদের ভবিষ্যৎ জীবনের স্বপ্নে বিভোর আর তক্ষুণি আবার: ধূ-র!… আমরা খুব আশান্বিত আর আমাদের ভেতরে বিদ্যুৎও খেলে যায় তখন। অপরদিকে দিনে-দিনে মাস, মাসে-মাসে বছর অতিক্রান্ত অথচ সে…। ফলত আমরা তার সঙ্গে একদম কথা বন্ধ করে দিই। সুকৌশলে আমাদের স্ত্রীরা তাকে গেট থেকে বিদায় করে দেয়। সে, ধূলিধূসর জামা-কাপড় পরিহিত ম্রিয়মাণ এখানে-ওখানে ঘুরে বেড়ায় আর রাত হলে কোনো এক বারান্দায় গিয়ে শোয়। আমরা কিন্তু খুঁজে বেড়াই, চুপিচুপি, আমাদের মধ্যে কেউ কাউকে জানায় না, এককভাবে সেটি খুঁজে পেতে তৎপর তথাপি সক্কলে ব্যর্থ অতঃপর ভাবি যে শালা, বাউণ্ডুলে ওটা হারিয়ে ফেলেছে কোথাও! এরপর আমরা নিজেরাই, অপরকে প্রতিদ্বন্দ্বী ভেবে মহৎ কর্ম সম্পাদনে আত্মনিয়োগ করি। ব্যর্থ হই। কেউ কেউ আবার চেষ্টা করি। এবং ব্যর্থ হই। আমাদের স্ত্রীরা তিতি-বিরক্ত। তথাপি অবস্থা সামলে সচেষ্ট কিন্তু ব্যর্থ-ব্যর্থ-ব্যর্থ… এবং ব্যর্থতার ইতিহাস। হতাশা আমাদের অপূর্ণ করে এবং পরিপূর্ণভাবে আমরা আশাহত হই। তখন ভাবি (হয়তো ওরাও ভাবে) ওর কাছে যাই, গিয়ে ক্ষমা চাই। দেখি, সেখানে আমাদের সক্কলে উপস্থিত। (ওর সামনে আমরা দিগম্বর হয়ে পড়ি) আমাদেরকে সে হাসিমুখে অভিনন্দিত করে অবশেষে প্রস্তাবিত হলে অস্বস্তির মধ্যে পড়ে যাই আমরা।

তুই আমাদের মাফ করে দে ভাই।

সে মধুরতর হাসে, বলে, আমি তো ওর সন্তান। আর ও মারা গেছে অনেক বছর হয়।

আমরা বিস্মিত, বিস্ময়ের ঘোর কেটে অতঃপর আমরা সমস্বর,

কিন্তু ওর ঐ জিনিসটা (!)—

জানি না।

নিশ্চয়ই তুমি জানো।

জানি না আমি। আমি ওর সন্তানের সন্তান আমি।

প্যাঁচে পড়ে যাই আমরা। ঘোরতর প্যাঁচ। সে বলে: দেখুন, এটা শুধু আমারই। আমি আসলে আপনাদের ওর কেউ নই।  আমরা দেখি: হ্যাঁ। ঠিক। ওর তো নয়। এ আরেক সৃষ্টি—একান্ত এর। এরই। তার বেলায় আমরা যা পারিনি, সক্কলে এর গলা টিপে ধরি। একটি প্রাণের মৃত্যু ঘটাই আমরা। বলা বাহুল্য অশ্লীলভাবে আমরা যা পেতে চেয়েছিলাম তা আমাদের অধিকারে আসেনি শেষ পর্যন্ত।

আর আসে না কখনও।

তানজিন তামান্না

 

নিশ্চিহ্ন

রাত ১২ টা… ১টা… ২টা… ৩টা… কিছুতেই ঘুম আসছিলো না তিতিরের। এপাশ-অপাশ আর ছটফট করতে লাগলো সে। কোনো দুঃশ্চিন্তা নয়, ঘুমটা এক্কেবারে ডিসটিউন হয়ে গেছে ভাবলো তিতির। প্রচন্ড মাথা ব্যাথাও শুরু হলো রাত সোয়া তিনটা নাগাদ। যেসব রাতে ঘুম আসেনা তার খুব মনে পড়ে দাদীর কথা… দাদী থাকলে রাতে ঘুমানোর সময় কতো গল্প শোনাতো, পুঁথি পড়ে শোনাতো, পিঠ চুলকে দিতো আর নবাব নন্দিনীর মতো ঘুমিয়ে পড়তো তিতির।

তিতিরের দাদী প্রায় ৯৫ বছর পর্যন্ত বেঁচে ছিলেন। এক বাতের ব্যাথা ছাড়া বৃদ্ধার কোনো অসুখ ছিলোনা। ছেলে ব্যাথার জন্য ব্যাথা নাশক ট্যাবলেট দিতো আর দিতো গ্যাসের ট্যাবলেট। এই ওষুধ খেয়েই ব্যাথা নিয়ন্ত্রণ করতেন। এখনকার দিনের মানুষের মতো হাই প্রেসার, ডায়াবেটিস ছিলোনা তাঁর। তিতির ক্লাস ফাইভ থেকে দাদীর সাথে ঘুমাতো। রাতে ঘুমানোর সময় দাদী আদরের নাতনিকে মনোহরী গল্প, পুঁথি পাঠ করে শোনানোর পাশাপাশি তাঁর জীবন কাহীনি শোনাতেন। সেসব কাহিনী থেকে উঠে আসতো তাঁর পদ্মার পারের শৈশব। তিতিরের দাদীর শৈশব কেটেছে ণিশ্চিন্তপুর নামে এক অজপাড়াগাঁয়। কয়েক শরিকের খুনকার বাড়ির মেয়ে ছিলেন তিনি। বাড়ির পাশ দিয়ে বয়ে চলা পদ্মা নদীতে ছেলেদের যাওয়ার নিয়ম থাকলেও, বাড়ির মেয়ে-বউদের যাওয়ার চল ছিলোনা। তাই খুব ইচ্ছা থাকলেও নদীতে নাইতে যেতে পারেননি বৃদ্ধা। আর সে কারণেই হয়তো তাঁর আর জীবনে সাঁতার শেখা হয়নি। ছোটোবেলায় দাদীর খেলার সাথীদের একজন নাকি ছিলেন তাঁর আপন সমবয়সী মামা। তিতিরের এই কথা জেনে ছোটোবেলায় খুব বিস্ময় লাগতো-আপন মামা তাও সমবয়সী! নিশ্চিন্তপুর নামটা শুনলে আর গ্রামটার কথা ভাবলে তিতিরের বুকের ভেতরটা কেমন হু হু করে উঠতো… যেমন এখন ঘুম না আসা রাত্রিগুলোতে দাদীর কথা মনে পড়লে হয়। মাঝরাতে প্রায়ই কাঁপুনি শুরু হতো তিতিরের। তখন দাদী তাকে বুকের ভেতর জড়িয়ে নিয়ে রাখতো। দাদীর সাথে মাঝেমাঝে ঝগড়াও বাঁধতো তার। এখন সেসব কথা ভাবলে কষ্ট লাগে তিতিরের- আহা! কতো কষ্ট পেয়েছে দাদী!

তিতিরের মা যখন রেগে গিয়ে ছোটো ভাইকে দু একটা চড় থাপ্পর মারতো বৃদ্ধা খুব কষ্ট পেতেন, মনে হতো চর, থাপ্পরগুলো তাঁকেই মারা হচ্ছে। এরকম সময় তিনি বলতে থাকতেন- আ হা হা রে, ইস! তার এগুলোকে আর কে পাত্তা দেয়। তাঁর আ হা হা রে থেকে উঠে আসতেন সৈয়দ কোবাত আলী, তিতিরের দাদা। যিনি মারা গিয়েছিলেন তিতিরের মা-বাবার বিয়েরও আগে। দাদীর কাছে তিতির শুনেছে, ভাই যখন মায়ের পেটে ছিলো তখন দাদী নাকি দাদাকে স্বপ্নে দেখেছিলেন। আর তিতিরের মায়ের চেহারা নাকি দাদীর শ্বাশুড়ীর মতো দেখতে। তো স্বপ্ন আর চেহারা মিলে তিতিরের ভাই ছিলো তার দাদার পুনঃজন্ম। ছোটো হলেও তিতিরের এসব বিশ্বাস হতোনা কিন্তু দাদী কষ্ট পাবে ভেবে কখনও জানায়ওনি কিছু।

বৃদ্ধার এক পীর ভাই ছিলো আব্দুল হাই। তিনি নাকি মানুষকে দেখলে মনের কথা বলে দিতে পারতেন। আগে নাকি তিনি এসেছেন এ বাড়িতে, অবশ্য তিতির তাঁকে কখনও দেখেনি। দাদীর কাছে এই ভাইয়ের কথা শুনলে তিতিরের খুব ভয় লাগতো- যদি তিনি কোনোদিন তাদের বাড়ি আসেন আর বুঝে ফেলেন যে তিতির মনে মনে তার হাউজ টিউটরের প্রেমে পড়েছে! তিনি নাকি একবার এবাড়িতে এসে বলেছিলেন এখানে জ্বীন আছে, এখানকার কোনো গাছ কাটলে অনেক বড় বিপদ হতে পারে! গাছ কাটার জন্য না হলেও অন্য নানাকারণে তিতিরদের বাড়িটা বিক্রি হয়ে যায়। আর দাদীর গ্রামের বাড়িতো নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে কতোকাল আগের নদী ভাঙনে। বসত বাড়ি হারিয়ে দাদীর বাবা চলে এসেছিলেন গ্রাম ছেড়ে, আরেকটা নদী ইছামতির পাশে জমি কিনে বাড়ি করেছিলেন। ওই বাড়িটাকেই তিতিররা দাদীর বাপের বাড়ি বলে জানে।

 

উপল বড়ুয়া

 

খোদা আদম সম্পর্কিত সুসমাচার

বহু বরফাচ্ছাদিত পর্বত, খাড়া পাহাড়, ভয়াল অরণ্য, হিংস্র নদী, দূ’কূলদৃশ্যহীন সাগর ও তপ্ত মরুভূমি পার হয়ে্ আদম অবশেষে পৌঁছলেন তাবৎ দুনিয়ার সৃষ্টিকর্তা মহান খোদার কাছে। খোদা তখন অন্ধকারের চেয়েও বিষণ্ন অন্ধকার এক গুহায় পদ্মাসনে বসে ছিলেন ধ্যানরত অবস্থায়। আদম সহস্রতকোটি মা্ইল পথ ভ্রমণে ক্লান্ত এবং বহু প্রতীক্ষার অবসানের পর হীরকদ্যুতির খোদাকে দেখে নিজের আবেগ সংবরণ করতে পারলেন না আর। জ্ঞানে ও অজ্ঞানে আদম কাঁদতে লাগলেন। আনন্দ ও উদ্যমে আদম হাসতে লাগলেন। তারপর প্রভূত মাধুর্যমণ্ডিত শব্দবাণে খোদার প্রশংসা করতে লেগে গেলেন, হে মহান ত্রাতা, খোদা, এই বিশ্বসংসারের প্রতিষ্ঠতা, জগৎশ্রেষ্ঠ, অদ্বিতীয়, আগুন জলের বিন্যাসকারী, দুঃখ সুখের জন্মদাতা, শয়তান অন্ধকার দমনকারী, মনুষ্যকারিগর, প্রজ্ঞাবান, গরীবের বন্ধু, জগৎবিধাতা

আদম এইরূপ প্রশংসার পর প্রশংসা করে যেতেই লাগলেন দিনের পর দিন।শত ও সহস্য বৎসর। খোদা এতদিন ধৈর্যসহকারে চুপচাপ ও আদমের প্রশংসা গুণে মুগ্ধ হলেন।হাসলেন। গৌরবান্বিত হলেন। তারপর একদিন ইশারায় জানালেন, ধীরে, আরও ধীরে। কিন্তু আদমের থামার কোন লক্ষণ তিনি দেখলেন না। আদমের এহেন কাণ্ডজ্ঞানে খোদার ধ্যানে বিচ্যুতি ঘটতে লাগলো সময়ে সময়ে। কিন্তু আদম স্তুতির পর স্তুতি করেই যাচ্ছেন তো করেই যাচ্ছেন। হঠাৎ আদমের অতি প্রশংসায় তিনি ত্যক্ত-বিরক্ত হয়ে রেগে গেলেন। কাঁহাতক আর সহ্য হয় এত প্রশংসা! তিনি তখন আদমের অতি প্রশংসাতে বিরক্তি ও রাগে চক্ষু সামান্য খুলে আকাশের দিকে তাকাতেই আকাশ ভেঙে বৃষ্টি ও বিকট শব্দে বিদ্যুৎ চমকাতে লাগলো। এরপর তাঁর তর্জনীসহকারে ভূ-পৃষ্ঠে কিঞ্চিৎ ঠোকা দিতেই দুনিয়া জুড়ে শুরু হয়ে গেল ভূ-কম্পন। সামান্য থুথু ফেলতেই পৃথিবী ভেসে গেলো বন্যায়।

দুনিয়ার এমন কঠিন রূপ দেখে আদম ভয়ে ঠকঠক করে কাঁপতে লাগলেন। তবু তাঁর সাহসে এলো না খোদাকে কিছু জিজ্ঞেস করার। মহাশ্রেষ্ঠ খোদা তখন তাঁর রাগ কমাতে পরপর পর্বতসমান জ্বলোচ্ছ্বাস ও ঘূর্নিঝড় বয়ে দিলেন জগতে। মরুঝড়ে ঢেকে গেলো খেজুরবৃক্ষের গলা পর্যন্ত। এভাবে চললো দিনের সুর্যাস্ত পর্যন্ত। এরপর ভয়ে জবথবু বুদ্ধিসম্পন্ন আদম ভীত ও হাতজোড়ে খোদাকে জিজ্ঞেস করলেন, খোদা, দুনিয়ার কি আজ ক্রান্তিকাল?’ সৌম্যকান্তির খোদা তদ্রুপ আগের মতোই ধ্যানমান; ভরাট কিন্তু সুমিষ্ট কণ্ঠে জানালেন, না, তুমি তোমার ভাইদের অতি প্রশংসায় আমি ক্লান্ত বিরক্ত।

 —‘তাহলে, প্রভু, আপনি কি প্রশংসা শুনতে আগ্রহী নন?’ আদম বিনয়ের সঙ্গে জিজ্ঞেস করলেন।

—‘অবশ্যই আমি প্রশংসা ও গুণগান শুনতে আগ্রহী। যেহেতু আমি দিনের পর দিন কষ্ট করে মাটি থেকে প্রাণ নিয়ে তোমাদের বানিয়েছি।  অজস্য ঝামেলার মধ্যেও তোমাদের দিকনির্দেশনা ও পালন করি প্রতিদিন। সুতরাং আমার প্রশংসা করো পরিমাণ মতো। যতটুকু আমি। এবং ভুলে যেও না আমার প্রিয় ভাই, বন্ধু ও পুত্র প্রিয় শয়তানকে। যে তোমাদের প্রতিনিয়ত স্মরণ করিয়ে দেয় আমার অস্তিত্ব। আর ফলে তোমরা আমার স্তুতি ও শরণ গ্রহণ করো প্রতিনিয়ত।

—‘প্রভু, আমি উপলব্ধি করেছি। আমি বুঝেছি। তাহলে আমার হৃদয়ের ভাইবোন মানুষদের জন্য কি বার্তা নিয়ে যাব ফেরার আগে?’

—‘মানুষের জন্য আমার প্রেম ও জ্ঞান নিয়ে যেও। এবং অবশ্যই বলবে তাদের, তোমাদের খোদা, তোমাদের অতি প্রশংসাতে ক্লান্ত ও বিরক্ত। তাদেরকে বলবে, জল তোমাদের তৃষ্ণা মেটায়, তোমরা জলকে ভালোবাসো। পাখি তোমাদের গান শুনায়, তোমরা পাখিকে মেরো না। বৃক্ষ ছায়াদানকারী প্রকৃত বন্ধু, তোমরা বৃক্ষকে যত্নে রেখো। ভালবাসো জন্মদাত্রী পিতা ও মাতাকে। বিষফোঁড়ার মতো জ্ঞানকে বয়ে চলো অবিরাম। অর্থ নয়, কীর্তি নয়, বিপন্ন বিষ্ময় হোক তোমাদের বেঁচে থাকার গান।’

খোদা তাঁর বার্তা ও উপদেশ দিয়ে পুনরায় ডুবে গেলেন ধ্যানে। জগৎ চলমান। তিনি এখন দিব্যচোখে অবলোকন করবেন দুনিয়া। তাঁর দায়িত্ব কেবল দেখা। তিনি মানুষকেও দায়িত্ব দিয়ে দিয়েছেন একেকটা। আদমকে দিয়েছেন বার্তা বহনের ভার। সুতরাং আদম অক্লান্ত চললেন পুনরায় পাহাড় ভেঙে, নদী সাঁতরে মানুষের কাছে। শাস্তা খোদার বার্তা নিয়ে। মানুষ বড় অসহায় ও নির্বোধ, তাঁকে দাঁড়াতে হবে মানুষের পাশে।

মোহাম্মদ জসিম

 

বিস্মৃতি

রফিক সাহেব কোন কথা বলেন না, শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকেন। তাকে ঘিরে কিলবিল করে মানুষ। সারাদিন।

সবাই তাকে খুব যত্ন আত্তি করে। আদর করে খা‌ওয়ায়, স্নান করিয়ে দেয়। এটা ওটা প্রশ্ন করে।

একদল মানুষ আসে, যারা কিছুক্ষণ থেকে আবার চলে যায়। আরেকদল যায় না, চব্বিশ ঘন্টা তার পাশে ঘুরঘুর করে।

এদের কাউকেই চেনেন না তিনি। একদমই অচেনা। যে ছেলে মেয়েগুলো তাকে বাবা বাবা ডাকে এটা ওটা খেতে দেয় তাদের জন্য খুব মায়া লাগে তার। তিনি চুপচাপ মনে করার চেষ্টা করেন তার কোন ছেলে মেয়ে আছে কিনা।

যখন একটু একলা থাকেন তখন দেয়ালে টাঙানো ছবিটির দিকে এক মনে তাকিয়ে থাকেন তিনি। ছবিতে ওই ছেলে মেয়েগুলো আছে, আর আছে ওই মহিলা যে তার সাথে রাতের বেলা শোয়। এদের সাথে তার কোন কালে পরিচয় ছিলো কি না মনে করতে পারেন না তিনি।

তবে ছবিতে একজন বয়স্ক লোক আছে সবার মাঝখানে। এই লোকটা একবারও আসেনি। বাকি সবাই সারাদিন তার পাশেই ঘুরঘুর করে।

তবে কি ওই লোকটা মরে গেছে? নইলে আসছে না কেন!