তানজিন তামান্না

 

নিশ্চিহ্ন

রাত ১২ টা… ১টা… ২টা… ৩টা… কিছুতেই ঘুম আসছিলো না তিতিরের। এপাশ-অপাশ আর ছটফট করতে লাগলো সে। কোনো দুঃশ্চিন্তা নয়, ঘুমটা এক্কেবারে ডিসটিউন হয়ে গেছে ভাবলো তিতির। প্রচন্ড মাথা ব্যাথাও শুরু হলো রাত সোয়া তিনটা নাগাদ। যেসব রাতে ঘুম আসেনা তার খুব মনে পড়ে দাদীর কথা… দাদী থাকলে রাতে ঘুমানোর সময় কতো গল্প শোনাতো, পুঁথি পড়ে শোনাতো, পিঠ চুলকে দিতো আর নবাব নন্দিনীর মতো ঘুমিয়ে পড়তো তিতির।

তিতিরের দাদী প্রায় ৯৫ বছর পর্যন্ত বেঁচে ছিলেন। এক বাতের ব্যাথা ছাড়া বৃদ্ধার কোনো অসুখ ছিলোনা। ছেলে ব্যাথার জন্য ব্যাথা নাশক ট্যাবলেট দিতো আর দিতো গ্যাসের ট্যাবলেট। এই ওষুধ খেয়েই ব্যাথা নিয়ন্ত্রণ করতেন। এখনকার দিনের মানুষের মতো হাই প্রেসার, ডায়াবেটিস ছিলোনা তাঁর। তিতির ক্লাস ফাইভ থেকে দাদীর সাথে ঘুমাতো। রাতে ঘুমানোর সময় দাদী আদরের নাতনিকে মনোহরী গল্প, পুঁথি পাঠ করে শোনানোর পাশাপাশি তাঁর জীবন কাহীনি শোনাতেন। সেসব কাহিনী থেকে উঠে আসতো তাঁর পদ্মার পারের শৈশব। তিতিরের দাদীর শৈশব কেটেছে ণিশ্চিন্তপুর নামে এক অজপাড়াগাঁয়। কয়েক শরিকের খুনকার বাড়ির মেয়ে ছিলেন তিনি। বাড়ির পাশ দিয়ে বয়ে চলা পদ্মা নদীতে ছেলেদের যাওয়ার নিয়ম থাকলেও, বাড়ির মেয়ে-বউদের যাওয়ার চল ছিলোনা। তাই খুব ইচ্ছা থাকলেও নদীতে নাইতে যেতে পারেননি বৃদ্ধা। আর সে কারণেই হয়তো তাঁর আর জীবনে সাঁতার শেখা হয়নি। ছোটোবেলায় দাদীর খেলার সাথীদের একজন নাকি ছিলেন তাঁর আপন সমবয়সী মামা। তিতিরের এই কথা জেনে ছোটোবেলায় খুব বিস্ময় লাগতো-আপন মামা তাও সমবয়সী! নিশ্চিন্তপুর নামটা শুনলে আর গ্রামটার কথা ভাবলে তিতিরের বুকের ভেতরটা কেমন হু হু করে উঠতো… যেমন এখন ঘুম না আসা রাত্রিগুলোতে দাদীর কথা মনে পড়লে হয়। মাঝরাতে প্রায়ই কাঁপুনি শুরু হতো তিতিরের। তখন দাদী তাকে বুকের ভেতর জড়িয়ে নিয়ে রাখতো। দাদীর সাথে মাঝেমাঝে ঝগড়াও বাঁধতো তার। এখন সেসব কথা ভাবলে কষ্ট লাগে তিতিরের- আহা! কতো কষ্ট পেয়েছে দাদী!

তিতিরের মা যখন রেগে গিয়ে ছোটো ভাইকে দু একটা চড় থাপ্পর মারতো বৃদ্ধা খুব কষ্ট পেতেন, মনে হতো চর, থাপ্পরগুলো তাঁকেই মারা হচ্ছে। এরকম সময় তিনি বলতে থাকতেন- আ হা হা রে, ইস! তার এগুলোকে আর কে পাত্তা দেয়। তাঁর আ হা হা রে থেকে উঠে আসতেন সৈয়দ কোবাত আলী, তিতিরের দাদা। যিনি মারা গিয়েছিলেন তিতিরের মা-বাবার বিয়েরও আগে। দাদীর কাছে তিতির শুনেছে, ভাই যখন মায়ের পেটে ছিলো তখন দাদী নাকি দাদাকে স্বপ্নে দেখেছিলেন। আর তিতিরের মায়ের চেহারা নাকি দাদীর শ্বাশুড়ীর মতো দেখতে। তো স্বপ্ন আর চেহারা মিলে তিতিরের ভাই ছিলো তার দাদার পুনঃজন্ম। ছোটো হলেও তিতিরের এসব বিশ্বাস হতোনা কিন্তু দাদী কষ্ট পাবে ভেবে কখনও জানায়ওনি কিছু।

বৃদ্ধার এক পীর ভাই ছিলো আব্দুল হাই। তিনি নাকি মানুষকে দেখলে মনের কথা বলে দিতে পারতেন। আগে নাকি তিনি এসেছেন এ বাড়িতে, অবশ্য তিতির তাঁকে কখনও দেখেনি। দাদীর কাছে এই ভাইয়ের কথা শুনলে তিতিরের খুব ভয় লাগতো- যদি তিনি কোনোদিন তাদের বাড়ি আসেন আর বুঝে ফেলেন যে তিতির মনে মনে তার হাউজ টিউটরের প্রেমে পড়েছে! তিনি নাকি একবার এবাড়িতে এসে বলেছিলেন এখানে জ্বীন আছে, এখানকার কোনো গাছ কাটলে অনেক বড় বিপদ হতে পারে! গাছ কাটার জন্য না হলেও অন্য নানাকারণে তিতিরদের বাড়িটা বিক্রি হয়ে যায়। আর দাদীর গ্রামের বাড়িতো নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে কতোকাল আগের নদী ভাঙনে। বসত বাড়ি হারিয়ে দাদীর বাবা চলে এসেছিলেন গ্রাম ছেড়ে, আরেকটা নদী ইছামতির পাশে জমি কিনে বাড়ি করেছিলেন। ওই বাড়িটাকেই তিতিররা দাদীর বাপের বাড়ি বলে জানে।

 

মন্তব্য করুন

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

Create your website at WordPress.com
Get started
%d bloggers like this:
search previous next tag category expand menu location phone mail time cart zoom edit close