মাসুমুল আলম

 

সমবেত হত্যাকাণ্ড

আমরা তাকে বলতাম যে সে খুব বড়ো হবে। সে বলত, জানিস, আমাদের পরিবারের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা আছে। এতে আমাদের সকলের ভেতরে বিদ্যুৎ খেলে যায়, বলি: আমাদের তুমি খাওয়াও দোস্‌ত। তুমি একটা বড়ো কাজ করছ! সে তার এই কাজটির ব্যাপারে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায় না, কিন্তু আমাদেরকে সে খাওয়ায়, আমরা ঢেঁকুর তুলি তৃপ্তির। আমরা বলি: দোস্‌ত তুমি খুব নাম পাবা! ঐ ব্যাপারে সে পূর্বরূপ প্রতিক্রিয়াশূন্য। আর আমাদের জ্বলে যায়, বড্ড জ্বলে যায়… শালা! আমরা শলা করি আর ফলস্বরূপ দেখা যায় সে ক্রমে আসক্ত হয়ে পড়ছে…। এদিকে আমরা বাড়ি বানাই কিংবা তদ্রুপ উন্নতিতে তৎপর, গাড়িও বানাই (সংগ্রহ করি) আর সুন্দরী স্ত্রীও সংযোগ করি এক সময়…।

এখন দেখিবামাত্র আমরা তাকে এড়িয়ে যাই। তার সাথে আমরা সম্পর্কও নষ্ট করি যখন সে তার সমস্ত সম্পত্তি বিক্রি-বাটা করে আমাদের পেছনে খুইয়েছে দেদার আর তার নেশার পেছনেও উড়িয়েছে ধুমধাম। সে প্রায়শই বলত যে তাদের বংশে আত্মহত্যার প্রবণতা আছে আর জানতাম যে তার পিতামহ, পিতা এবং ফুফুও… সব্বাই একে-একে আত্মহত্যা করেছে। আমরা সব শখের ব্যক্তি, এবং আমরা সুখের পায়রা, শুনি: ও-ও মরলো…! আমরা আমাদের ভবিষ্যৎ জীবনের স্বপ্নে বিভোর আর তক্ষুণি আবার: ধূ-র!… আমরা খুব আশান্বিত আর আমাদের ভেতরে বিদ্যুৎও খেলে যায় তখন। অপরদিকে দিনে-দিনে মাস, মাসে-মাসে বছর অতিক্রান্ত অথচ সে…। ফলত আমরা তার সঙ্গে একদম কথা বন্ধ করে দিই। সুকৌশলে আমাদের স্ত্রীরা তাকে গেট থেকে বিদায় করে দেয়। সে, ধূলিধূসর জামা-কাপড় পরিহিত ম্রিয়মাণ এখানে-ওখানে ঘুরে বেড়ায় আর রাত হলে কোনো এক বারান্দায় গিয়ে শোয়। আমরা কিন্তু খুঁজে বেড়াই, চুপিচুপি, আমাদের মধ্যে কেউ কাউকে জানায় না, এককভাবে সেটি খুঁজে পেতে তৎপর তথাপি সক্কলে ব্যর্থ অতঃপর ভাবি যে শালা, বাউণ্ডুলে ওটা হারিয়ে ফেলেছে কোথাও! এরপর আমরা নিজেরাই, অপরকে প্রতিদ্বন্দ্বী ভেবে মহৎ কর্ম সম্পাদনে আত্মনিয়োগ করি। ব্যর্থ হই। কেউ কেউ আবার চেষ্টা করি। এবং ব্যর্থ হই। আমাদের স্ত্রীরা তিতি-বিরক্ত। তথাপি অবস্থা সামলে সচেষ্ট কিন্তু ব্যর্থ-ব্যর্থ-ব্যর্থ… এবং ব্যর্থতার ইতিহাস। হতাশা আমাদের অপূর্ণ করে এবং পরিপূর্ণভাবে আমরা আশাহত হই। তখন ভাবি (হয়তো ওরাও ভাবে) ওর কাছে যাই, গিয়ে ক্ষমা চাই। দেখি, সেখানে আমাদের সক্কলে উপস্থিত। (ওর সামনে আমরা দিগম্বর হয়ে পড়ি) আমাদেরকে সে হাসিমুখে অভিনন্দিত করে অবশেষে প্রস্তাবিত হলে অস্বস্তির মধ্যে পড়ে যাই আমরা।

তুই আমাদের মাফ করে দে ভাই।

সে মধুরতর হাসে, বলে, আমি তো ওর সন্তান। আর ও মারা গেছে অনেক বছর হয়।

আমরা বিস্মিত, বিস্ময়ের ঘোর কেটে অতঃপর আমরা সমস্বর,

কিন্তু ওর ঐ জিনিসটা (!)—

জানি না।

নিশ্চয়ই তুমি জানো।

জানি না আমি। আমি ওর সন্তানের সন্তান আমি।

প্যাঁচে পড়ে যাই আমরা। ঘোরতর প্যাঁচ। সে বলে: দেখুন, এটা শুধু আমারই। আমি আসলে আপনাদের ওর কেউ নই।  আমরা দেখি: হ্যাঁ। ঠিক। ওর তো নয়। এ আরেক সৃষ্টি—একান্ত এর। এরই। তার বেলায় আমরা যা পারিনি, সক্কলে এর গলা টিপে ধরি। একটি প্রাণের মৃত্যু ঘটাই আমরা। বলা বাহুল্য অশ্লীলভাবে আমরা যা পেতে চেয়েছিলাম তা আমাদের অধিকারে আসেনি শেষ পর্যন্ত।

আর আসে না কখনও।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

Create your website at WordPress.com
Get started
%d bloggers like this:
search previous next tag category expand menu location phone mail time cart zoom edit close