সুদেষ্ণা মজুমদার

 

হে ঈশ্বরী!

বিকালের আলো বড়োই ম্লান। আলোর মনে সুখ নাই। বিষণ্ণ হইয়াই আজ গোটা দিন কাটাইয়াছে। এখন যাইতেই হইবে। সূর্যের তেজ লজ্জাকর রকম কম ছিল। কিছুটা মেঘলা, কিছুটা ভেজা বাতাস কোথা হইতে আসিয়াছিল, অজানা। বৃষ্টি কিন্তু হয় নাই। বৃষ্টি হইলে খারাপ হইত না। আশ্বিনের আকাশে এখনো দুই-চারিটি ঘুড়ি না চাহিয়াও উড়িতেছে। কোথাও যেন বিশ্রামের অবকাশের অভাব। সূর্যও এই আকাশ ছাড়িয়া পাটে গিয়াছে মিনিট দুই হইল। টুপ করিয়া ঝরিয়া পড়িবার আগে গাছের মাথায় তাহার শেষ পরশটুকু দিয়া গিয়াছিল। সারাদিনে এইটুকুই রশ্মিপাত। অদ্যপি তাহাও হারাইয়া গিয়াছে। আগের মতো গাছই বা আর কোথায়! গাছের বদলে বহুতল গৃহের সারি। বড়ো বেখাপ্পা লাগে। কিন্তু করার কিছু নাই। না মনলতার না বিকালের।

বর্তমানে মনলতার বয়স খান পঞ্চাশেকও হয় নাই। চুলে পাক ধরিয়াছে। তা আজ নহে, কুড়ি বৎসর আগেই শুরু হইয়াছে। তখন তাহার যৌবন যতখানি তীব্র ছিল, আজ তাহা স্তিমিত হইয়াও যেটুকু বাঁচিয়া আছে, অনেক কিছু করিবার ক্ষমতা মনলতা রাখে। মনলতা ভাবিল, আজ রবিবার, আর একটু পরেই শেষ হইয়া যাইবে ছুটির দিনটি। আবার আগামী কল্য হইতে অফিস যাইতে হইবে। নামকরা প্রকাশনী সংস্থায় মনলতা ভালো বেতনে খাটিতে যায়। তাক হইতে নেশার দ্রব্যটি হাতে লইয়া বারান্দা হইতে কাপড় তুলিতে গেল সে। একটু আগে চা খাইয়াছে। দুধ-চিনি দিয়া কড়া করিয়া এক কাপ চা। মুখে চায়ের স্বাদ যাহা পড়িয়া আছে, বারবার মনে করাইতেছে, একটু নেশা করা যাক। নাহ্‌! কাপড়গুলি উঠাইয়া ঘরে রাখিয়া তাহার পর নেশা। তিষ্ঠ তিষ্ঠ।

না, মনলতার এখনো এতখানি বয়স হয় নাই যে সব বিস্মৃত হইবে। সে এ-গৃহে আসিয়াছে তা-ও প্রায় বছর দশেক হইল। দশ বৎসর পূর্বে এই এলাকায় যত গাছ ছিল, বারোতলার উপর হইতে দেখিলে মনে হইত জঙ্গল। মনলতা ভাবিতেছে। কাপড় তুলিয়া বারান্দার বামপার্শ্বের দরজার চৌকাঠে বসিয়া আকাশের দিকে তাকাইল মনলতা। হ্যাঁ, তাহার এই আধুনিক বাসস্থানটিতে এই বারান্দার দরজাতেই উচ্চতায় সামান্য বেশি একটি চৌকাঠ আছে। এখানে বসিয়া আকাশ-বাতাস দেখিবার নিমিত্তেই মনলতার ইচ্ছানুসারে প্রোমোটার ব্যক্তিটি এইরূপ দরজা বানাইতে বাধ্য হইয়াছিল। ঘরের অন্যান্য দরজার সহিত যা মানানসই নহে। মনলতার তাহাতে কিছু যায় আসে না। সে প্রয়োজন বোঝে, সাজসজ্জা বুঝিতে তাহার বইয়া গেছে। বাড়াবাড়ি লাগে। একার জীবনে আরামটুকুর সঙ্গে স্বস্তিই সে চাহিয়া আসিয়াছে। বিশ্রামের সময় হাত-পা ছড়াইয়া উপাধানে আয়েশ করিয়া শুইবার সময়ও সে আরামটুকুর কথা মাথায় রাখে। কেহ দেখিতে পারে, সে সুযোগ এই ঘরে নাই। একার আবার লজ্জা কীসের! মনলতা খোলামেলা থাকিতে পছন্দ করে। তাহার চোখে এইক্ষণে চশমা নাই। তাহাতে কোনো গোল বাঁধিবার অবকাশও নাই। কারণ, আকাশ দেখিতে চশমা লাগে না। খালি চোখে তাহার গতিবিধি নজরে আসে। আকাশে বিকাল পাড়ি দিতাছে সঙ্গে দুই-চারিটি ঘুড়ি। অবশ্য ঘুড়িগুলি এক-এক করিয়া মালিকের হস্তগত হইবার আশঙ্কায় ধীরে ধীরে অনিচ্ছাসত্ত্বেও নামিয়া আসিতেছে। অন্ধকারে তাহাদের উড়িতে কোনো ভয় নাই। ভয় তো মালিকদের। তাহারা উড়াইতে পারিবে না। দেখিতে পারিবে না ঘুড়ির গতিবিধি। দেখিতে পারিবে না ঘুড়ি কোন পথ ধরিয়া ঘুরিয়া বেড়াইতেছে। ঘুড়ি উড়িবে ঠিকই, কিন্তু মালিক তো ঠিক করিবে তাহার পথ। মনলতা ভাবিতেছিল, তাহার উড়াউড়ির বিষয়ে। যৌবনের সাধ তাহার এখনো আছে। যত্রতত্র উড়িবার। সাধ্য কমিয়া গিয়াছে।

হ্যাঁ, অনেক উড়িয়াছে মনলতা। তাহার দেহ সৌষ্ঠব যাহাই হউক না কেন। বাঙালি নারীর তুলনায় সে কিঞ্চিৎ লম্বা, গাত্রবর্ণ উজ্জ্বল শ্যাম, গায়ে মাংস আছে, চর্বি নাই। কেউ কেউ বলে, মনলতা কিছুটা যেন পুরুষালি ভাবের। নারীর মমতা তাহার দেহে নাই। হয়তো বা! মনলতার মাথার চুল ক্ষণস্থায়ী হইবার প্রয়াসে। দাঁতের গঠন মন্দ নহে। বাহির হইতে যতটুকু দেখা যায়। সে না হাসিলে বোঝা যায় না তাহার হাসিটি মনকাড়া। এক কথায় মনলতাকে সুন্দরী বলা চলে না। কিন্তু তাহার মন সৌষ্ঠব অপরিমিত। সেখানে কোনো আগল নাই। মনের গতির স্বভাব বলা চলে ঢিলেঢালা। ফলে, সে ধরা-বাঁধা জীবনে হাঁপাইয়া উঠে। মনে পড়িল বিল্বপত্রের কথা। নাম বিল্বপত্র, কিন্তু বড্ড একমুখী পুরুষ ছিল। অন্তত মনলতার পূজায় লাগে না। দেখিতে মন্দ ছিল না। সুগঠিত বাহুদ্বয়ের কথা মনলতার মনে পড়ে। এবং তাহার আঙুলের সুষমা। নিপুণ করিয়া কাটা নখ। পুরুষটি যত্ন লইত বটে! অবিশ্যি যতটা শরীরের, ততটা মনের নহে। মনলতার বিপরীতই বলা চলে। স্ত্রী-জাতির স্বচ্ছন্দ চলন-বলনে তাহার কেমন যেন আড়ষ্টতা ছিল। তবু মনলতা মন বাদ দিয়া বিল্বপত্রের শরীরের দিকে চাহিয়া থাকিত। যাহাতে যতটুকু সুখ। পেশীর বলিষ্ঠ চলনের পাশাপাশি দেহের কিঞ্চিৎ মেদ বিল্বপত্রকে লাবণ্যময় করিয়াছিল। মুখের গঠনেও কেমন একটি নম্র ভাব ছিল। এক ধরনের মেয়েলি নম্রতা। মনলতাকে মুগ্ধ করিত।

সন্ধ্যা ঘনাইয়া আসিতেছে। আর উন্মনা হইলে চলিবে না মনলতার। সন্ধ্যা আহ্নিকে বসিতে হইবে। এই একটা দিনই সে একটু ভালো করিয়া, মনের মতো করিয়া আহ্নিক করে। সকালে একদফা, সূর্য অস্ত যাইলে দ্বিতীয় দফা। মনলতা বারান্দা হইতে উঠিয়া ঘরে যাইল। গা ধুইতে উৎসাহী হইল। পরনের পোশাকগুলি সম্পূর্ণ ছাড়িয়া সুন্দর করিয়া গাত্র মার্জন করিয়া, পুনঃপুনঃ জল ঢালিয়া গা ধুইয়া পূজার শাড়িটি পরিধান করিল। খেয়াল করিলে দেখা যাইবে শাড়ি ছাড়িবার সময় তাহার কোমরের ভাঁজ হইতে নেশার দ্রব্যটি টুপ করিয়া মেঝেয় খসিয়া পড়ি্যাছে। মনলতা খেয়াল করিল না। ভুলিয়া গিয়াছে সেটির কথা। তাহার অঙ্গে এক্ষণে একটি গরদের শাড়ি, যাহার পাড়টি কালো। ভিতরে আর কোনো বস্ত্র নাই। পূজায় বসিলে সেলাই করা বস্ত্র পরিধান নিষিদ্ধ।

মনলতার পূজা-পদ্ধতি সম্পূর্ণ তাহার নিজস্ব। শৈশবে, কৈশোরে মা-দিদিমার পূজা সে যাহা দেখিয়াছে, তাহাতে তাহার কোনো কালেই আস্থা ছিল না। সে সর্বদাই নিজ-পন্থা অবলম্বনে আনন্দ পাইয়া থাকে। পূজাস্থানে প্রদীপ জ্বালাইয়া ধ্যানে বসিল। কপালের মধ্যখানে মনোনিবেশ করিতে চেষ্টা করিল। ঘরে আর কোনো বাতি জ্বলিতেছে না। মনোনিবেশের কেন্দ্রটিতে ঝিলিমিলি অন্ধকার দৃষ্ট হইল। দু-তিন পল পরেই সেই অন্ধকারে বিল্বপত্রের মুখচ্ছবি ফুটিয়া উঠিতেই মনলতা বিরক্ত হইল। এত বছর পরে কেন এইসব বিহ্বলতা, যাহা মনের নিবিষ্টতায় বিঘ্ন ঘটাইতেছে! বিকালেই যাহা শেষ হইয়া যাওয়া উচিত ছিল। অন্য কেহ নহে, কেবল বিল্বপত্র কেন? আরো কত মানুষই তো আসিয়াছিল মনলতার জীবনে। পূজার সময় এহেন আকস্মিক ঝঞ্ঝাবাত হইতে রক্ষা পাইতে বিক্ষিপ্ত মনলতা চক্ষু মেলিল। মন মাপিবার যন্ত্রের অভাব পুনরায় অনুভব করিল মনলতা। তাহার ইষ্ট দেবীর মুখে কোথাও যেন অল্প কারুণ্য। খুব ভালো করিয়া খেয়াল করিবার জন্য মনলতা প্রদীপখানি তুলিয়া ইষ্ট দেবীর মুখের সামনে ধরিল। না, এখন আর কারুণ্য নাই, সে-স্থলে দিব্য হাসি দেখিতে পাইতেছে। মনলতা আনন্দ পাইল। সে আবার চোখ বুজিয়া ধ্যানে নিমগ্ন হইল। শান্তি। আর বিল্বপত্রের ছবি নাই। এক অপার আঁধার, অপার সুষমামণ্ডিত মৃদু হাস্যযুক্ত সুগন্ধি শান্তি বিরাজ করিতেছে। এইরূপে বেশ কয়েক মিনিট কাটিয়া গেল। মনলতা বিভোর হইয়া ধূপের সৌরভে মিশিয়া গেল। পূজা শেষে মনলতা শঙ্খে ফুঁ দিলো। ততক্ষণ, যতক্ষণ পর্যন্ত তাহার নিঃশ্বাস রহিল। উৎফুল্ল হইল তাহার মন। মৃদু হাস্যে অবিচল মনলতা আদর করিল তাহার দেবীকে।

রাত্রি খুব ধীর গতিতে আসিতে চাহিতেছে।

 

দুই

আজ সোমবার। আজ অফিস। আলস্য করিবার উপায় নাহি আর। আগামী ছয়টি দিন অপরের জীবনের উন্নতি হেতু মনলতা ঘূর্ণ্যমান হইয়া কাটাইবে। বিতৃষ্ণা আসিতেছে। চাকুরিটি ছাড়িয়া দিবার কথা প্রায়ই ভাবে সে। পারে নাই। মাসান্তে কয়েক মুঠি নগদ টাকা তাহাকে আবিষ্ট করিয়া রাখে। টাকার পরিবর্তে কত কিছু পাওয়া যায়! কতটা প্রয়োজন মনলতার? নিজের বলিতে আর কেহ তো নাই তাহার জীবনে। সবাই মনলতাকে ছাড়িয়াছে না মনলতা সবাইকে ছাড়িয়াছে, আজ তাহা অপ্রয়োজনীয়। এ-বয়সে এইরূপ বাতুলতা আর সুখানুভূতি দেয় না। তড়িদ্‌গতিতে প্রস্তুত হইতে লাগিল মনলতা। মনে করিবার চেষ্টা করিল শনিবারের কথা। অফিসে কোন কর্মটি সে অসমাপ্ত ছাড়িয়া আসিয়াছিল। মনে পড়িল না। কিছুতেই না। ফলে, একটি খিঁচ মনলতার মনে মাথা চাড়া দিয়া উঠিল। মনে করিতে পারিল না, কোনো কাজ সে বাড়িতে লইয়া আসিয়াছিল কিনা। কাজের টেবিলে ভালো করিয়া চোখ বুলাইয়া দেখিল কোনো দরকারি কাগজপত্র পড়িয়া আছে কিনা। একবার নিজের কাঁধের ব্যাগটিও পরীক্ষা করিল। নাই। তবুও খিঁচটি দূর হইল না। একটা গণ্ডগোল তো কোথাও অবশ্যই হইতেছে!

শাড়ি পরিয়া প্রাতঃরাশ করিবার জন্য খাবার টেবিলে বসিল মনলতা। ঘড়ির দিকে চোখ গেল তাহার। আটটা বাজিতে দশ। জন্মেজয় নির্ঘাত আসিয়া গাড়ি লাগাইয়া দিয়াছে। জন্মেজয় তাহার ড্রাইভার। আজ অবধি একটি বারের জন্যও এই ছেলেটি সময় ভুল করে নাই। রাগ হয় মনলতার। ভুল করিতে পারিত। কে বারণ করিয়াছে? আলস্য। আলস্য। মনলতাকে সপ্তাহের প্রথমদিন আলস্য ঘিরিয়া ধরিয়াছে। এটা ইদানীং প্রায়শই ঘটিতেছে। একটি লম্বা ছুটি কি মনলতার এই আলস্য দূর করিতে পারিবে? ফালতু চিন্তা, চিঁড়ার মধ্যে দধি ঢালিতে ঢালিতে ভাবিল সে। চিনি লইবে না। উঠিয়া ফ্রিজ হইতে একটি নরম পাকের সন্দেশ লইয়া আসিল। ইহাতে মিষ্টি যতটুকু আছে, কম নহে। তাড়াতাড়ি খাওয়া শেষ করিয়া হাত ধুইয়া ইষ্ট দেবীর নিকট গিয়া কয়েক মুহূর্ত দাঁড়াইয়া রহিল মনলতা। বিদায় লইল তাহার প্রিয়তমার কাছ হইতে। এই ছোট্ট একটি মূর্তি কি শুধুই মূর্তি? দেবীকে হাতে তুলিয়া বুকের কাছে ধরিল। চুম্বন দিলো দেবীর কপোলে। রাখিয়া দিলো দেবীকে। গুছাইয়া লইল যাহা কিছু বহনের। মনটাকে পায়ের জূতাতে আবদ্ধ করিল। প্রস্তুতি সম্পূর্ণ। দরজায় তালা লাগাইয়া সিঁড়ির দিকে পা বাড়াইল মনলতা।

গাড়িতে উঠিবার পূর্বে মনলতা একবার নিজ-গৃহ পানে চাহিল। বারান্দায় কেহ অপেক্ষায় নাই জানিয়াও সে মুখ তুলিয়া বারোতলার দিকে দৃষ্টিপাত করিল। কূটাভ্যাস! ভাবিল, দরজা বন্ধ করিয়াছে তো? তালা? তালা কি সবকিছু রক্ষা করিতে পারে? সংশয় মনলতার আবাল্য। দ্বিধা। বিশ্বাস। নির্ভরশীলতার কাঙ্ক্ষা। সব মিলিয়া এক চতুষ্পার্শ্বিক টানাপোড়েন। মনলতার জীবন ছাইয়া রহিয়াছে এইরূপ নানাবিধ সমাধান-অযোগ্য টানাপোড়েনে। যদিও, সম্ভবত মনলতা সমাধানে বিন্দুমাত্র প্রয়াসী নহে। জীবন যেভাবে তাহাকে যাহা দিতাছে, দিয়া আসিয়াছে, সহজভাবে তাহা গ্রহণ করিতে মনলতা কার্পণ্য করে না। শাড়ির পাড়ের নকশা লইয়া তাহার কোনোদিন মাথাব্যথা নাই। যে কোনো জিনিসই খুব কটকটে না হইলেই হইল। তাহার চোখে, অবশ্যই। এ লইয়া মনলতা কদাপি ঝুট-ঝামেলায় যায় না। তাহার স্বভাবে একটি আপাত নির্লিপ্ততা আছে। মুচকি মুচকি হাসি আছে। তবে সর্বদা সে এইরূপ নির্লিপ্ত নহে। দায়িত্ব পালনে সে কঠোর। কিন্তু, তাহার কাছে বেশ কিছু বিষয় তুচ্ছ, যাহা অপরাপর মানুষের কাছে প্রবল গুরুত্বপূর্ণ। মনলতার হাসিটি বড়ো মনোরম। সেটি তাহার কখনো কখনো রক্ষাকবচও বটে।

সকালের একটু একটু কুয়াশা-কুয়াশা ভাব। যদিও ঋতু অন্য। শীত আসিতে এখনো বেশ দেরি। শীত আসিলে জন্ম আসিবে। শীত আসিলে দুঃখ আসিবে। শীত আসিলে কিছু চাদর এলোমেলো উড়িবে। মনলতা শীতের সন্তান। কিছুদিন আগে পর্যন্ত তাহার শীত ঋতু অপছন্দের ছিল। ইদানীং শীতের প্রতি একটি টান আসিতেছে। তাহা উত্তাপ হেতু কিছুটা তো বটেই, আমেজের বিষয়টিও একপ্রকার উল্লেখনীয়। একটু গুটাইতে ইচ্ছা করে। ধনেপাতা গাছের ঝিরঝিরে অবয়বে হাত বুলাইতে ইচ্ছা করে। আঁধার-ভোরে ঝোপ হইতে ছিঁড়িয়া আনা কচি-কচি সবুজ মৌরি মুখে দিয়া কলিকাতার বাস ধরিতে ইচ্ছা করে। শৈশবে ফেরা যায় না। তাহা ছেঁড়া-ছেঁড়া। দু-একটি ঝলক মাত্র।

ঘুমাইয়া পড়িয়াছিল মনলতা। রাত্রে তাহার ঘুম যে ভালো হয় নাই তাহা নহে। তবু কেন যে সে ঘুমাইয়া পড়িল, রহস্য। গাড়ির চালকের ‘ম্যাডাম’ ডাকে ঘুম ভাঙিয়া মনলতা প্রথমে বুঝিতেই পারিল না কোথায় আসিয়াছে। আয়নার মধ্য দিয়া চালকের পানে দু-এক পল তাকাইয়া থাকিল মনলতা। চালক কোনোরূপ ধৃষ্টতা দেখাইল না। সে চুপ করিয়া অন্য দিকে তাকাইয়া রহিল। মনলতা ভাবিল, আমি কি বৃদ্ধ হইয়া গেলাম? বয়স তো পঞ্চাশও ছোঁয় নাই! এমন তো আগে কখনো হয় নাই! এই জায়গাটায়ই তাহার অফিস, মনলতা এক্ষণে বুঝিল। হাত দিয়া মুখ মুছিয়া চালককে কিছু না বলিয়াই মনলতা গাড়ি হইতে নামিয়া গেল। চলন একটু যেন শ্লথ। পায়ে জোর একটু কম বোধ করিতেছিল সে। ঘাড়ে একটু ব্যথা অনুভবে সে বুঝিল ঘুমাইবার সময় তাহার মাথা ঝুঁকিয়া পড়িয়াছিল নিশ্চয়। নাকি, রাত্রে শুইবার দোষে? ঘাড়ে হাত বুলাইতে বুলাইতে মনলতা অফিস-বাড়ির দরজা ঠেলিয়া ভিতরে প্রবেশ করিল। দারোয়ান তাহাকে পরিচিত সেলাম ঠুকিল। সেদিকে মন দিবার অবকাশ নাই মনলতার। হাসিখুশি, দরদি মনলতা সচরাচর এমনটা করে না। দারোয়ান একটু অবাক হইল। দীর্ঘ দিন এই সংস্থায় সে কাজ করিতেছে। বেশি কিছু সে চাহে না, সামান্য তাহার চাহিদা। ওপরওয়ালাদের এক টুকরা হাসি।

কর্মঠ মনলতা ভাবিল, তাহার দিন কি শেষ হইয়া আসিতেছে? একার জীবনে এইরূপ নানাবিধ চিত্তচাঞ্চল্য ঘটিতে পারে বলিয়াই মনে হয়। মনলতা অফিস করে, বাজারহাট করে, ক্ষুৎপিপাসা নিবারণ করে, আজকাল বন্ধু-বান্ধব বিশেষ না থাকায় বাহিরের জগতে তাহার খুব একটা যাতায়াত নাই। যৌনতা নিবারণের ইচ্ছা আর তেমনটা হয় না। বলা যাইতে পারে, এক ধরনের স্থিতাবস্থায় দিন কাটায় মনলতা। এবং হয়তো বা এই কারণে, সে ইদানীং ঈশ্বরীমুখীন। হ্যাঁ, তাহার মানসভ্রমণ ঈশ্বর নহে, ঈশ্বরীর প্রতিই অনুগত। এই বিশাল সৃষ্টি, নারী ছাড়া আর কে করিবে? প্রাণের সৃষ্টি করিবার ক্ষমতা কোনো পুরুষের থাকিতে পারে না। মনলতার চারিপার্শ্বে প্রাণের প্রাচুর্য তাহাকে বিচলিত করে। সে ভাবে, আহা, এত প্রাণ, সেখানে তাহার মতো এমত অণুসম একটি প্রাণ কেমনে বাঁচিয়া আছে।

মৃত্যুচিন্তা? এত শীঘ্র! হঠাৎ তাহার বারান্দায় রাখা গাছগুলির কথা মনে হইল। সকালে কি জল দিয়াছিল সে? নাকি ভুলিয়া গিয়াছে। এ এক নূতন অসুখ হইয়াছে মনলতার। ভুলিয়া যাওয়া। মৃত্যু কি আসন্ন? ভুলিয়া যাওয়া, স্মৃতিকাতরতা, যখন-তখন ঘুমাইয়া পড়া নানাবিধ মনোবিকলনের লক্ষণ বলিয়া ধার্য করিতে চাহিলেও উপেক্ষা করিতে পারিল না মনলতা। কিন্তু সব কর্মের অবসান তো এখনো হয় নাই। সত্যই কি কোনো কর্ম এখনো বাকি রহিয়াছে? কী কর্ম করিবার জন্য মনলতা জন্মিয়াছিল? স্বামী-কন্যা-পুত্র-সংসার—এই সমস্ত প্রতিপালনের নাম কি কর্ম সম্পাদন? সে পথে যদি কেহ না যায়, তাহা হইলে তাহার কী কোনো কর্ম নাই? নাকি এই যে মনলতা নিয়মিত অফিসে আসে, দায়িত্ব পালন করিয়া কয়েক মুঠি টাকা উপার্জন করে, রান্না করিয়া খায়, পূজা করে, বাজারহাট করে, বা আরো যা-যা সব, সেগুলিকে কি কর্ম বলা চলে? নাকি অপরের জন্য কিছু করার নাম কর্ম? এবম্বিধ ক্ষুদ্র-ক্ষুদ্র চিন্তা লাগাতার মনলতার মস্তিষ্কে ঘুণপোকার ন্যায় কুটকুট করিতে লাগিল। মনলতা সব ঘুণপোকা ঝাড়িয়া ফেলিয়া তাহার নিজস্ব চেয়ারে উপবেশন করিল। তৎক্ষণাৎ তাহার মনে পড়িল অফিসের যাবতীয় কাগজপত্র ইত্যাদি যে চেস্টে থাকে, তাহার চাবিটি শনিবার বাড়ি ফিরিয়া ব্যাগ হইতে অকারণে বাহির করিয়াছিল! নির্ঘাত বাড়িতেই ফেলিয়া আসিয়াছে। এতক্ষণে খিঁচটি পরিষ্কার হইল। হাসিল মনলতা। তাহার সেই মনোরম হাসিটি।

গল্পের বাকী অংশ আগামী সংখ্যায় প্রকাশিতব্য

  

 

 

2 thoughts on “সুদেষ্ণা মজুমদার

  1. ভালো লাগলো! বাকী পর্বগুলোর অপেক্ষায় রইলাম…

    Liked by 1 person

  2. ধন্যবাদ… অবশ্যই আগামী সংখ্যায় পড়তে পারবেন….

    Like

মন্তব্য করুন

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

Create your website at WordPress.com
Get started
%d bloggers like this:
search previous next tag category expand menu location phone mail time cart zoom edit close