সুদেষ্ণা মজুমদার

হে ঈশ্বরী!

পর্ব- ২

তিন

না, কোনোদিনও গ্রামে থাকে নাই মনলতা। যায় নাই এমনটাও নহে। আজকাল যাইতে ইচ্ছা করে খুব। শৈশবের গ্রাম আর পাওয়া যাইবে না, তাহা জানে মনলতা। তবু প্রকৃতিকে হয়তো সেইখানেই ছুঁইতে পারিবে সে। তাহার আজন্মের বাস এই শহর কলিকাতা। তবে ঠাঁইবদল হইয়াছে বার কয়েক। জিনিসপত্র গাঁটরি বাঁধিয়া টেম্পোর উপর চাপাইয়া শহর হইতে আরো দূরে শহরতলিতে যাইয়া উঠিতে হইয়াছে। সবই বাসাবদলের গল্প। বাড়িওয়ালার বাক্যবাণ সহিতে না পারিয়া; কখনো-বা কোনো যুক্তিতেই আর থাকা চলিবে না; বড়ো খোকার বিবাহ, ঘর লাগিবে ইত্যাদি। সুতরাং বাসা ছাড়িতে হইবে। মনলতার বেশ মজাই লাগিত। নূতন বাসায় যাওয়া, নূতন জায়গা, মন্দ কী? কচি বয়সে বিদ্যালয় বিষয়টি না মনলতার না তাহার গুরুজনদের মাথাব্যথার কারণ হইত। হইত বড়ো দাদা বা দিদিদের ক্ষেত্রে। মনলতা তাহার মাতা-পিতার সর্বাপেক্ষা কনিষ্ঠ সন্তান। আদর-যতন ভাগ হইতে হইতে তলানিতে ঠেকিয়াছিল। তাঁহাদের উৎসাহে ভাটা পড়িয়াছিল। অস্বাভাবিক নহে। খাইবার পেট সাতটি। রোজগেরে মানুষ একজন, মনলতার পিতা। রাজ্য সরকারে চাকুরি করিতেন তিনি। মনের প্রফুল্লতা না থাকারই কথা। মনলতার এতকিছু বুঝিবার বয়স না হইলেও সে বুঝিতে পারিত, কোথায় যেন একটু খামতি থাকিয়া গিয়াছে। ভালোবাসা বা আদর বুঝিবার জন্য বুদ্ধি, বিদ্যা বা বয়স লাগে না। একজন মানসিক ভারসাম্যহীন মানুষ, যাহাদের খুব সহজেই আমরা ‘পাগল’ বলিয়া পার পাইয়া যাই, বুঝিতে পারে কে তাহাকে ভালোবাসিতেছে, যত্ন করিতেছে। বা অসুস্থ, জ্ঞানহীন মানুষও। প্রয়োজন যা, তাহা স্পর্শ। সেই স্পর্শ লইয়া মনলতার বিধবা পিতামহী বুঝিতেন সবটা। ইহা লইয়া আক্ষেপ করিতেন না কুন্দমালা, মনলতার পিতামহী। কিঞ্চিৎ কষ্ট পাইতেন। গোপনে। তিনটি সন্তান—দুটি কন্যা, একটি পুত্রের পর পুনরায় আর একটি কন্যার জন্য প্রস্তুত ছিলেন না মনলতার মাতা-পিতা। হইয়া গিয়াছে—এই ভাবিয়া তাঁহারা অদৃষ্টকে আড়ালে আবডালে দোষারোপ করিতেন। মনলতা অনুভব করিত। পিতামহী সামলাইবার চেষ্টা করিতেন পৌত্রীকে। গল্প-উপন্যাসের চরিত্রের ন্যায় ছিলেন পিতামহী কুন্দমালা। সর্ব কনিষ্ঠা কোলপোঁছা পৌত্রীর প্রতি একটি টান ছিল তাঁহার। তিনিই নিজের নামের সহিত কিঞ্চিৎ অর্থ মিলাইয়া নাম রাখিয়াছিলেন মনলতা। বুদ্ধিমতী, আধুনিক, শিক্ষিতা এবং চোখ-কান খোলা পিতামহী কনিষ্ঠা পৌত্রীটিকে বুকে টানিয়া লইয়াছিলেন। ভবিষ্যৎ দেখিতে পাইবার কেমন যেন এক শক্তি ছিল তাঁহার। আর কাহারো ক্ষেত্রে নহে, কেবলমাত্র মনলতার ক্ষেত্রে তিনি কেমন ভাববিহ্বল হইয়া বলিয়াছিলেন, ‘মনদিদি, দুঃখ পাবি অনেক, ভেঙে পড়িস না।’ এ শুধু মনলতা আর তাহার পিতামহীর বাক্যালাপ। একান্তে। না, শৈশবে বুঝিত না ইহার মানে কী। কিন্তু ভাবিত, তাহা হইলে কি রবির মায়ের মতো দুঃখে জীবন কাটিবে? লোকের বাড়ি বাসন মাজিয়া? রবির মা প্রায়ই বলিত, ‘এত দুঃখ যেন শত্রুও না পায়। ভগবান…’ পিতামহীকে প্রশ্ন করিয়াছিল, ‘ঠাকুমা, শত্রু মানে কী?’ পিতামহী হাসিয়া বলিয়াছিলেন, ‘বড়ো হও, বুঝবে।’ ঠিক তাহাই হইয়াছিল, শত্রু শব্দটির মর্মোদ্ধার মনলতা করিল আরো কিছু বড়ো হইয়া। কিন্তু, মনলতা কখনো ভাঙিয়া পড়ে নাই। জ্ঞানত শত্রু তৈয়ার করিতে মনলতা অপটু।

পিতামহী গান গাহিতে জানিতেন। মনলতার মন ভুলাইবার জন্য রবি ঠাকুরের একটি গান প্রায়শই গাহিতেন—‘তুই ফেলে এসেছিস কারে মন মন রে আমার…’ মনলতা কল্পনা করিত, তখন কল্পনারই বয়স, রবি ঠাকুর তাহার কথা ভাবিয়াই এই গানটি রচনা করিয়াছিলেন। ওই যে ‘মন’ শব্দটি! কৌতূহলী মনলতা পিতামহীকে প্রশ্ন করিত, ‘ঠাকুমা, রবি ঠাকুর আমার জন্যই গানটা লিখেছেন? আমার নাম জানলেন কীভাবে? তুমি বলেছ?’ কুন্দমালা শিশু বালিকার মন রাখিতে বলিতেন, ‘হ্যাঁ ছোড়দিভাই তোমারই জন্য! তবে আমি বলিনি সোনা। তিনি তো ঠাকুর, সব জেনে যান।’ ইদানীং অবরে-সবরে মনলতা গুনগুন করিয়া ওঠে—‘মন মন রে আমার…’ শান্তি পাইল কি পাইল না তাহা ভাবে না সে। তাহার যে বলিবার মতো কোনো অশান্তি আছে, মনে তো হয় না। ও স্বভাব মনলতার নাই। সে মচকাইয়া পড়ে, আবার উঠিয়া দাঁড়ায়। আছে যাহা, অল্পস্বল্প। গুরুত্ব না দিবারই চেষ্টা করে মনলতা। কৈশোরে, যৌবনে যাহা গুরুত্ব পাইবার বিষয়, পঞ্চাশের কোঠায় দাঁড়াইয়া তাহা অনেকাংশে গুরুত্বহীন হইয়া পড়ে। মনের গতি ভিন্নমুখী হয়। খোঁজ পালটাইয়া যায়। গভীরের খোঁজে যাইতে চায়।

মনলতার দাদা-দিদিদের প্রতি কুন্দমালার যে টান ছিল না তাহা নহে। যথেষ্ট ছিল। কিন্তু মনলতার প্রতি যতটা, তাহা হইতে অবশ্য কিছুটা বোধহয় কমই হইবে। দাদা-দিদিরা বুঝিত। আক্ষেপ করিত। তাহা কাটাইবার জন্য পিতামহীকে মাতা-পিতার কান এড়াইয়া যতটা মৃদু স্বরে ডাকা যায়, ‘বুড়ি!’ বলিয়া ডাকিয়া মনের উষ্মা প্রশমিত করিত। এইরূপ নোংরা অভ্যাস তাহারা কোনোভাবেই গৃহ হইতে পায় নাই। এ পাড়া-প্রতিবেশীর দান। শৈশব-কৈশোরে দেওয়া প্রথম গালি। মনলতা রাগিয়া যাইত ভীষণ। তখন কুন্দমালার কতই বা বয়স? ষাট-বাষট্টি হইবে। তিনি হাসিতেন। এ-বিষয়ে কুন্দমালা নিজ-স্বভাবের বিরুদ্ধে কদাপি যাইতেন না। এক পরম স্নিগ্ধতা তাঁহার দেহে-মনে বিরাজ করিত। যতদিন বাঁচিয়া ছিলেন সংসারটিকে আগলাইয়া রাখিয়াছিলেন। চার সন্তানের মাকে সর্বদা কাজ হইতে নিষ্কৃতি দিবার চেষ্টা করিতেন। সারাদিন কাজ আর কাজ—এই ছিল কুন্দমালার দিনলিপি। সন্ধ্যা হইলে মনলতাকে সঙ্গে করিয়া বই লইয়া বসিতেন। বই পড়ার অভ্যাস মনলতার তখনই তৈয়ার হয়। পরবর্তী জীবনে যাহা মনলতাকে প্রভূত সহায়তা করিয়াছে। মনলতার মাতা-পিতা কুন্দমালার সহিত সর্বদা মনোরম সম্পর্ক বজায় রাখিয়াছিলেন। কুন্দমালার টাকাকড়ি বিশেষ ছিল না, যে, তাহা পাইবার জন্য এই সম্মান। হ্যাঁ, প্রয়াত স্বামীর পেনশন পাইতেন তিনি। আজ হইতে চল্লিশ বৎসর পূর্বে যাহা ছিল খুবই সামান্য। তাহা হইতে সামান্য কিছু হাতে রাখিয়া বাকিটা পুত্রবধূর হাতে তুলিয়া দিতেন। হাতখরচ হিসাবে। কুন্দমালা বিত্তের বড়াই কদাপি করিতেন না। যদিও কিছু ভারী গহনা তাঁহার ছিল, বিবাহসূত্রে প্রাপ্ত। পুত্রবধূকে যাহা দিবার দিয়া বাকি গহনাগুলি রাখিয়া দিয়াছিলেন পৌত্রীদের জন্য এবং পৌত্রবধূর জন্য। বিত্ত নহে, নিজ চরিত্রের কারণেই তিনি সংসারে সম্মান পাইতেন। দৃঢ় চরিত্র ও মৃদু স্বভাবের নারীটির গড়নপিটন ছিল কিছুটা হয়তো-বা পুরুষালি। লম্বা; মেয়েদের তুলনায় একটু বেশিই যেন চওড়ার দিকে। দিঘল চক্ষুদ্বয় মেলিয়া তিনি যখন কাহারো দিকে তাকাইতেন, পল্লবে ছায়া ঘনাইত। ভয়ে নয়, ভক্তি-শ্রদ্ধায়। গাত্রবর্ণ ততটা ফর্সা নহে। কুঞ্চিত কেশ, কোমর পর্যন্ত। এই বৈশিষ্ট্য মনলতার দেহেও প্রতীয়মান। ইদানীং মনলতা প্রায়শই শাড়ির অঞ্চলের প্রান্ত ধরিয়া, হয়তো বা পাকাইতে পাকাইতে আপন মনে বলিয়া উঠে, ‘কেমন করে পারতে ঠাকুমা!’ ছটফটাইয়া উঠে সে। ইহা তো ভালো লক্ষণ নহে! দীর্ঘশ্বাস ফেলিয়া বলিয়া উঠে, ‘নাহ্‌, অনেক কিছু করবার আছে।’ কিন্তু মনলতা ইহাও জানে, তাহার তেমন কিছু হয়তো-বা করিবারও নাই।

মনলতার মনে পড়ে শহরের উপকণ্ঠে একবার একটি বাসাবাড়িতে একটি পেয়ারা ও একটি নিম গাছ ছিল। আর ছিল গৃহ-লাগোয়া সামান্য কিছু ফাঁকা জমি। জমির বেড়ায় রাংচিতার ঝোপ। মোটা মোটা পাতা। মুচড়াইলে সাদা সাদা দুধের মতো ঘন কষ বাহির হইত। অগ্রহায়ণের শেষে মনলতার দাদা-দিদিদের বাৎসরিক পরীক্ষা সমাপ্ত হইবার পর তাহারা শ্যামবাজার অঞ্চলের বাসাবাড়িটি ছাড়িয়া সেইখানে গিয়া উঠিয়াছিল। শহরের তুলনায় অনেক ফাঁকা চারিধার। বিজলি বাতির চল সেই স্থলে তখনো শুরু হয় নাই। সন্ধ্যা হইলেই হ্যারিকেন জ্বলিত, ঘরের কোণে ঠাকুরের আসনে প্রদীপ। আর ডাকিত ঝিঁঝি পোকা। ছিল মশার কামড়। ভয় পাইলে মনলতা পিতামহীকে জড়াইয়া ধরিত। কুন্দমালা হাসিয়া ভয় ভাঙাইবার প্রয়াস করিতেন। ভোরের কুয়াশা অনেকক্ষণ পর্যন্ত চারিধার আচ্ছন্ন করিয়া রাখিত। ওই একফালি জমিতে কুন্দমালা কিছু শাক-সবজির গাছ লাগাইয়াছিলেন। মনলতা পিতামহীর পিছন-পিছন ঘুরিয়া বেড়াইত। হাতে-পাতে কাজ করিত। আর কুন্দমালা মনলতাকে গাছ চিনাইতে চিনাইতে গল্প করিতেন, ‘জানিস দিদু, আমি যখন ছোটো ছিলাম, একটা গ্রামে থাকতাম। সেখানে অনেক গাছ ছিল, পুকুর ছিল। এখানকার চেয়ে অনেক বেশি গাছ। আর অনেক বড়ো একটা পুকুরও ছিল জানিস! আমি কত সাঁতার কেটেছি সেই পুকুরে। শিখবি নাকি সাঁতার?’ মনলতা মুগ্ধ হইয়া পিতামহীর গল্প শুনিত। প্রশ্ন করিত, ‘সাঁতার কোথায় শিখব ঠাকুমা? আমাদের বাড়িতে তো পুকুর নেই!’ পিতামহী পৌত্রীর ছেলেমানুষিতে মজা পাইতেন। বলিতেন, ‘দুপুরবেলায় খেয়ে উঠে তোকে নিয়ে যাব। দেখবি কত বড়ো পুকুর।’ মনলতা চোখ গোল-গোল করিয়া প্রশ্ন করিত—

–তুমি কবে দেখলে? আমাকে নিয়ে যাওনি কেন?

কুন্দমালা পৌত্রীর অভিমানকে সম্মান দিয়া বলিলেন—

–তুমি তখন ঘুমাচ্ছিলে সোনা। আমি আশপাশটা দেখতে গিয়েছিলাম তো! কোথায় কী আছে, দেখে না রাখলে কি চলে? তুমিই বলো, আমি সবার বড়ো না? আমাকে তো দেখতেই হবে। তাই তো জানলাম এখানে পুকুর আছে, পুকুরের জলে সাঁতারকাটা মাছ আছে, সাদা-সাদা হাঁস সাঁতার কাটে। আজ আমি আর তুমি চুপিচুপি গিয়ে দেখে আসব। ঠিক আছে? আচ্ছা, এখন এই শিমের ডালটা ধরো দেখি, একটু ভালো করে বেঁধে মাচায় তুলে দিই। তুমি না সাহায্য করলে আমার যে কী হত!

মনলতার অভিমান নিমেষে দূর হইয়া গেল। সে তড়িদ্‌গতিতে লাফ দিয়া গাছের ডাল ধরিল। যতটা পারে পা উঁচা করিয়া পিতামহীকে সহায়তা করিতে চেষ্টা করিল। দাদা বা দিদিরা নহে, একমাত্র মনলতাকেই ঠাকুমা কাজে সহায়তা করিতে বলিতেছেন, এইটা যে মনলতার কত বড়ো প্রাপ্তি! তাহার দৃষ্টি কুন্দমালার মুখে। সেইখানে ইঙ্গিতে যদি সামান্য প্রশংসাও সে দেখিতে পায়—এই আশায়। কুন্দমালা মৃদু হাস্যে ডাল বাঁধিতে লাগিলেন। কাজ শেষে মনলতাকে কোলের কাছে টানিয়া বলিলেন, ‘আমার এই সোনা দিদিটা না থাকলে যে কী হত! আমি কোনো কাজটাই যে করতে পারি না তোমাকে ছাড়া।’ বলিয়া মনলতার গণ্ডদেশে সস্নেহ চুম্বন দিলেন। আরক্তিম মনলতা লাফাইতে লাফাইতে পিতামহীর আগে-আগে চলিতে লাগিল। হঠাৎ পিছন ফিরিয়া পিতামহীকে বলিল, ‘ঠাকুমা, ঝোলা গুড় খাবে? কাল বাবা এনেছে!’ এমন ভাবে বলিল যেন কুন্দমালা এ-সংবাদ জানেন না। শুনিলে চমকিয়া উঠিবেন! কুন্দমালা হাসিলেন। বলিলেন, ‘চলো খাই!’

 

চার

সেদিনের সেই চাবি ফেলিয়া অফিসে যাওয়া মনলতাকে যার-পর-নাই আশঙ্কিত করিয়াছিল। অফিসে কাহাকেও কিছু বলে নাই সে। মালিকের কাছে সব চাবির ডুপ্লিকেট চাবি রাখা থাকে। মনলতা মালিকের ঘরে গিয়া তাহার চেস্টের ডুপ্লিকেট চাবিটি নিবে বলিয়া মালিককে ডাকিল, ‘তন্ময়বাবু!’ তন্ময়বাবু মাথা নীচু করিয়া টেবিলে রাখা কিছু কাগজপত্রের প্রতি নিবিষ্ট ছিলেন; জিজ্ঞাসু চোখ দুটি তুলিয়া মনলতার দিকে চাহিলেন। ‘আমার চেস্টের চাবিটা একটু নিচ্ছি।’ ভদ্রলোক মুখে কিছু না বলিলেও তাঁহার দৃষ্টিতে প্রশ্ন ফুটিয়া উঠিল। মনলতা বলিল, ‘খুঁজে পাচ্ছি না। বাড়িতে বোধহয় ফেলে এসেছি।’ অবাক তন্ময়বাবু বিস্ময়ের ভাব কাটাইয়া সহজ হইলেন। মুখ খুলিলেন, ‘এমন তো আপনার হয় না!’ মনলতা মৃদু হাসিয়া জায়গা হইতে চাবি বাহির করিয়া তন্ময়বাবুকে বলিল, ‘ওবেলা ম্যাটারটা নিয়ে আসব। কিছু আলোচনা করার আছে। আপনি থাকবেন তো?’ তন্ময়বাবু জিজ্ঞাসা করিলেন, ‘কোন ম্যাটারটা?’ মনলতা বলিল, ‘বৃহস্পতিবার এডওয়ার্ড-এর যে ম্যাটারটা দিলেন। ইকোয়াল ব্যালেন্স!’ ‘হ্যাঁ হ্যাঁ… সাড়ে চারটে পর্যন্ত।’ হাসিমুখে সংক্ষিপ্ত উত্তর তন্ময়বাবুর। খুশি হইল মনলতা। এই মানুষটি যতটুকু প্রয়োজন ততটুকু কথাই বলিয়া থাকেন। কিন্তু তাহা বলিয়া অমার্জিত নন। ভদ্রলোক জানেন কতটুকু কথা বলিলে কতটুকু কাজ হয়। মনলতা এঁর সঙ্গে কাজ করিতেছে আজ প্রায় চৌদ্দ বৎসর হইবে। উনি কাজের মানুষ চিনেন। নিজে যেরূপ অক্লান্ত পরিশ্রম করেন, অন্যের ভিতর হইতে মার্জিত ভাবে, সহমর্মী হইয়া কীভাবে কাজ বাহির করিয়া লইতে হয়, তাহাও জানেন। প্রকাশনা জগতে তন্ময় চৌধুরী একটি বিশিষ্ট নাম। তাঁহাকে চিনেন না এমন কেহ অন্তত প্রকাশনা জগতে নাই। মনলতা বাহির হইয়া যাইতেছিল, পিছন হইতে তন্ময়বাবু ডাকিয়া বলিলেন, ‘মনলতা, ম্যাক্স-এর রিপোর্টটা কি হাতে এসেছে? আমার কাছে কিন্তু কোনো মেল আসেনি। আপনার কাছে এসেছে? একটু চেক করবেন তো!’ মনলতা বলিল, ‘এখনো কম্পিউটার খুলিনি। দেখে আপনাকে জানিয়ে দেবো।’ মনলতা চাবি লইয়া বাহির হইয়া গেল। সে খেয়াল করিলে দেখিত তন্ময় চৌধুরী তাহার চলিয়া যাইবার দিকে চাহিয়া আছেন। এত বড়ো সংস্থা চালাইতে গেলে জানাইয়া না-জানাইয়া সব কর্মীর উপর নজর রাখিতে হয়, জানেন তন্ময়বাবু। সে যে পদের কর্মীই হউক না কেন। মনলতা বুদ্ধিমতী, কর্মঠ, নিয়মানুবর্তী, তবু তাহার উপরেও নজরে রাখিতে হয়। বিশেষ করিয়া আজকের চাবির বিষয়টি তন্ময় চৌধুরীকে অবাক করিয়াছে! কী হইল, জানিবার চেষ্টা করিতে হইবে। তাঁহার একটি কর্মীও কোনো সমস্যায় থাকিলে ক্ষতি তাঁহার সংস্থার। এগুলি দেখিবার লোক আছে, তবু তিনি নিজের দায়িত্ব অস্বীকার তো করেনই না, নীরবে তাহা পালন করেন।

নিজ ঘরে আসিয়া মনলতা চাবি ঘুরাইয়া চেস্ট খুলিল। একে-একে হাত বুলাইয়া ফাইলগুলি ছুঁইল। এখন কোনো ফাইলই কাজে আসিবে না। এডওয়ার্ডের পুস্তকটি লইয়া তন্ময়বাবুর সহিত আলোচনায় বসিতে হইবে, বলিয়া আসিয়াছে। সুতরাং, এই ফাইলটি লইয়া কিছু কাজ করিয়া লইতে হইবে। লাঞ্চব্রেকের আগেই শেষ করিতে হইবে। কম্পিউটার চালু করিল মনলতা। নেট কানেকশন করিয়া প্রথমেই দেখিয়া লইতে হইবে ম্যাক্স-এর মেলটি আসিয়াছে কিনা। মনলতার কাছে আসিলে আশা করা যায় তন্ময়বাবুর কাছেও আসিবে। উনি তো বলিলেন আসে নাই। নেট-এর চক্রটি ঘুরিতেছে। হ্যাঁ, এতক্ষণে কানেকশন আসিল। নিজের মেল খুলিল মনলতা। আসে নাই। মেল খোলা থাক। আসিলে টের পাইবে সে। অফিসে এটি তাহার নিজস্ব চেম্বার। ছোটো হইলেও নিজস্ব। যে চেয়ারটিতে মনলতা বসে, তাহা বেশ আরামদায়ক এবং পিছনে হেলাইয়া বসা যায়। মনলতা কিছু সময় নিজেকে মেলিয়া দিল চেয়ারটিতে। ভাবিল, এত ক্লান্ত কেন লাগিতেছে? কোনো কাজে যেন মন নাই। অথচ, এই মাসেই পুস্তকটি প্রকাশ করিয়া বাজারজাত করিতে হইবে। মাথায় আছে সে কথা। পুস্তকটি লইয়া বেশ কিছু কাজ এখনো বাকি আছে। ভালো করিয়া খুঁটাইয়া পাণ্ডুলিপি পড়িতে হয়। মনলতার চেম্বারে সহায়ক পুস্তকের স্তূপ। কখন কোনটা কাজে লাগে! তন্ময়বাবু এ-ব্যাপারে কার্পণ্য করেন না। মনলতার যখন যে পুস্তকটির প্রয়োজন হয় পারচেস ডিপার্টমেন্ট-এ জানাইয়া দেয়। তন্ময়বাবুর নির্দেশ, মনলতা কোনো পুস্তক চাহিলে সত্ত্বর যেন তাহা আনাইয়া দেওয়া হয়। মনলতার উপর তন্ময় চৌধুরী প্রচুর দায়িত্ব দিয়াছেন এবং নির্ভরও করেন। মনলতা তাহার কোনোরূপ ব্যত্যয় করে না। কুন্দমালার কথা মনে পড়িল। বলিতেন, ‘মনদিদি, সারা জীবন মাথা উঁচু করে থাকবি। কেউ তোকে যেন অপমান না করতে পারে। আর একটা কথা, নিজের রোজগারে চলবি। মনে থাকবে তো?’ মনলতার তখন ষোলো, মাধ্যমিক পরীক্ষা শেষ হইয়াছে। ফলের অপেক্ষায় ছুটি কাটাইতেছে। সে জানিত কুন্দমালা কখনো অপ্রয়োজনীয় কথা বলেন না। কুন্দমালার বুকে মুখ গুঁজিয়া মনলতা বলিয়াছিল, ‘মনে থাকবে ঠাকুমা।’ কুন্দমালা মনলতার মাথায় হাত বুলাইতে বুলাইতে আবারও বলিলেন, ‘আমি কিন্তু থাকব না। আমার দিন শেষ হয়ে আসছে।’ যদিও তাহার পর তিনি আরো বছর পাঁচেক বাঁচিয়াছিলেন। মনলতার দুই দিদির বিবাহ, দাদার গৃহত্যাগ করিয়া প্রবাসবাস দেখিয়া গিয়াছেন। ‘নিজের সিদ্ধান্ত নিজেকেই নিতে হবে। এমন কোনো কাজ করবি না, যার জন্য পশ্চাতাপ করতে হয়। ভবিষ্যতের পাশাপাশি অতীতটাকেও ভাবতে হয়। বুঝেছ? তোমার বয়স এখনো অনেক কম, হয়তো বুঝবে না। খালি মাথায় রেখো তোমার কর্মফল তোমাকে এ-জন্মেই ভোগ করতে হবে। আর কেউ তোমার পাশে থাকবে না ভেবে নিয়েই সব কাজ করবে। এমন কোনো কাজ করবে না, যাতে কী করলাম, এই ভাবনায় ব্যাকুল হতে হয়। চেষ্টা করলে অনেকটাই হবে। কী? চুপ কেন?’ মনলতা বুক হইতে মাথা তুলিয়া কুন্দমালার দিকে চাহিয়া বলিয়াছিল, ‘মনে রাখব ঠাকুমা। চেষ্টা করব। আর তুমি চাইলেও আমাকে ছেড়ে কোনোদিন যেতে পারবে না। তবু বলি, ভুল করলে আমাকে ধরিয়ে দিয়ো। আমি ঠিক টের পাব।’ পারে নাই, মনলতা কুন্দমালার কথা রাখিতে পারে নাই। ভুল করিয়াছে, অনেক ভুল। পশ্চাতাপও হয়। কুন্দমালা ধরাইবার চেষ্টা করিয়াছেন, সব সময় পারেন নাই। এই সব লইয়াই বুঝি মনলতার আজকাল মনের এই অবস্থা। তাহার দিন কি শেষ হইয়া আসিতেছে? জলের কাছে যাইতে ইচ্ছা করে। বারবার। মনলতা তাহার টেবিলে রাখা ঘণ্টাটি বাজাইল।

ঘণ্টা শুনিয়া ভুবনেশ্বর আসিয়া দরজা খুলিয়া দাঁড়াইল। মনলতা হাসিয়া জিজ্ঞাসা করিল, ‘চা হবে রে?’ দুই সন্তানের জনক, বাইশ বছরের ভুবনেশ্বর হাসিমুখে মাথা নাড়িয়া হ্যাঁ বলিল। মনলতা আবার বলিল, ‘তাহলে আমাকে এক কাপ চা দে না রে! এক চামচ চিনি দিস কিন্তু। আর, দুধও দিস। বেশ কড়া করে বানাবি। আর দুটো বিস্কিটও দিস।’ ভুবনেশ্বর একটু অবাক হইল যেন-বা। মনলতা ম্যাডাম তো এমন চা কোনোদিন খান না। যদিও মনলতা গতকালও এইরূপ চা পান করিয়াছে। ভুবনেশ্বরের তাহা জানিবার কথা নহে। সে ভাবিল, আজ হইল কী! ভুবনেশ্বর মাথা নাড়িয়া চলিয়া যাইতেছিল, মনলতা ডাকিয়া বলিল, ‘একটা পানও নিয়ে আসিস।’ ভুবনেশ্বর আবারও মাথা নাড়িল। মনলতা ভাবিল, দুধ-চিনি দিয়া চা খাইলে হয়তো এই মনমরা ভাবটি কাটিয়া যাইবে। চিনি তো এনার্জি দিবে। আর চিনি দিলে দুধও লাগে মনলতার। চায়ের কথা ভাবিতেই মনমরা ভাবটি যেন এক ঝটকায় অনেকটা কাটাইয়া উঠিল মনলতা। আবার একবার মেল চেক করিল। আসে নাই। চেস্ট হইতে এডওয়ার্ডের ফাইলটি বাহির করিল। পেজ মার্ক ধরিয়া নির্দিষ্ট পাতাটি বাহির করিয়া লাল কালির কলমের ঢাকনাটি খুলিল। মার্ক করিতে হইবে। তন্ময়বাবুর কাছে আধ খ্যাঁচড়া কাজ লইয়া যাইবার কোনো অর্থ হয় না। মনলতা মন দিয়া পড়িতে লাগিল। লাল কলমটি হাতে ধরা।

গল্পের বাকী অংশ আগামী সংখ্যায় প্রকাশিতব্য

Advertisements

মন্তব্য করুন

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s